রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৪ অপরাহ্ন




পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র: ঝুঁকি নিয়ে চালু হচ্ছে রূপপুর

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬ ১১:২৪ am
পরমাণু RNPP বিদ্যুৎ Rosatom Pabna Ruppur Rooppur Nuclear Power Plant PROJECT পাবনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিউক্লিয়ার ইউরেনিয়াম রোসাটম
file pic

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের প্রত্যাশা, আসছে আগস্ট মাসের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে উৎপাদন শুরুর আগমুহূর্তেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এখনও হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ স্পেন্ট ফুয়েল অপসারণের চূড়ান্ত চুক্তি। নির্ধারিত হয়নি বিদ্যুতের দাম। বাকি রয়েছে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সমঝোতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি লোড বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই একমাত্র সফলতা নয়; বরং এর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর্থিক বিবেচনায় দেশের একক বৃহত্তম এই প্রকল্প নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই নির্মাণকাজ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বেশ কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাচ্ছে। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ। এই ক্ষতিকর বর্জ্য রাশিয়া পুনর্ব্যবহারের জন্য ফেরত নিয়ে যাবে, নাকি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে–সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ার ব্যয়ভার কেমন হবে– তাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) চূড়ান্ত না হওয়ায় বিদ্যুতের দাম নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

কেন্দ্রটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনও অমীমাংসিত।
এই নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞের মতে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে এই চুক্তিগুলো অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। এখন তাড়াহুড়ো করে এগুলো করলে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল নাও আসতে পারে। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই চুক্তিগুলো সম্পাদন করে এর শর্তাবলি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা জরুরি। গ্রিড ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামার ঝুঁকি এড়াতে রূপপুর কর্তৃপক্ষ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন। দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় সব কিছু একসঙ্গে করতে গেলে কোনোটিই মানসম্মত হবে না। তবে ফুয়েল নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি আছে এবং ব্যবস্থাপনা চুক্তির কাজও অনেক দূর এগিয়েছে।’ রাষ্ট্রীয় দুই কোম্পানির বিষয় হওয়ায় পিপিএ নিয়েও তিনি চিন্তিত নন।

তিনি জানান, কোনো ঘাটতি থাকলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়, তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী মাসের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে ইউনিটটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুতের দাম এখনও অজানা
দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে পিপিএ সম্পন্ন হতে হয়, যার ভিত্তিতে পাইকারি দাম বা ট্যারিফ নির্ধারিত হয়। তবে রূপপুরের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন ঘনিয়ে এলেও এই চুক্তি সই হয়নি। পিডিবি প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালন খরচ চেয়ে বারবার চিঠি পাঠালেও রূপপুর কর্তৃপক্ষের সাড়া মেলেনি।

পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পারমাণবিক কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া সাধারণ গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে জটিল, কারণ এখানে ঋণের কিস্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিকমিশনিং ব্যয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাত যুক্ত থাকে।

ট্যারিফ চুক্তি না হওয়ায় বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য এসেছে। ২০২০ সালে প্রতি ইউনিটের দাম চার থেকে সাড়ে চার টাকা দাবি করা হলেও ২০২৩ সালে সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়। বর্তমানে শুধু উৎপাদন খরচই ধরা হচ্ছে চার টাকা ৩১ পয়সা। এর সঙ্গে যখন রাশিয়ার ঋণের সুদ, বিদেশি জনবলের পরিচালন ব্যয় এবং উচ্চ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ যুক্ত হবে, তখন প্রকৃত দাম জানা যাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘আমার কাছে যতটুকু তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১১-১২ টাকা হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। পরিবেশবিদরা শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন। এর মধ্যেও এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। তাই দেশের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিলে রূপপুরের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি।

স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে ধোঁয়াশা
প্রকল্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো স্পেন্ট ফুয়েল বা ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। দেড় থেকে দুই বছর চলার পর রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ধরে রাখতে প্রতিবার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়, যা প্রচণ্ড উত্তপ্ত ও উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়াসম্পন্ন। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এটি স্থায়ী সংরক্ষণের অবকাঠামো না থাকায় শুরুতে পরিকল্পনা ছিল এই বর্জ্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। দুই দেশের মধ্যে এই বিষয়ে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মতিপত্র সই হলেও স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফেরত নেওয়ার কোনো চূড়ান্ত বা বাধ্যতামূলক চুক্তি এখনও সম্পাদিত হয়নি। রাশিয়া এই বর্জ্য তাদের দেশে নিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে, নাকি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে এবং এর বিশাল ব্যয়ভার কে বহন করবে, তার আর্থিক রূপরেখা এখনও অস্পষ্ট।

জাতীয় গ্রিডের ঝুঁকি
রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন সক্ষমতা। পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে অপরিবর্তনীয় মাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, কিন্তু দেশের গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা দিন ও রাতের ভেদে ব্যাপক ওঠানামা করে। হঠাৎ চাহিদা কমে গেলে বা ঝড়বৃষ্টির সময় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঞ্চালনের ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ হার্টজের নিচে নেমে গেলে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট হতে পারে। তবে পিজিসিবি সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সম্পন্ন করার দাবি করেছে।

ড. জাহেদুল হাছান জানান, রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ পিজিসিবিকে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন অনেক আগেই সরবরাহ করেছে এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

বাকি আরও চুক্তি
দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণসহ (ওঅ্যান্ডএম) একাধিক জরুরি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও চূড়ান্ত হয়নি। কেন্দ্রের পরবর্তী ৬০ থেকে ৯০ বছরের জীবনকালে নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও কারিগরি জ্ঞান নিশ্চিত করা জরুরি। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রথম তিন বছর জ্বালানি সরবরাহ করবে, তবে এর পরের দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম আমদানির কোনো চুক্তি সই হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং আপৎকালীন প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তিগুলোর বেশির ভাগই ঝুলে আছে। কর্মকর্তারা প্রথম ইউনিট চালুর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকায় এগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। তবে কেন্দ্র চালু হওয়ার পর দরকষাকষি করতে গেলে পরিচালনার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেবে।

ঋণ পরিশোধে জটিলতা
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের রূপপুর প্রকল্প দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক ঋণনির্ভর প্রকল্প, যার প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারই এসেছে রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়ায় রাশিয়ার ঋণের অর্থ পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিকল্প পদ্ধতিতে পাওনা পরিশোধের আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। এর আগে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য নেওয়া প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে তাও আটকে আছে। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে রাশিয়ার পাওনা অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। সুইফট ব্যবস্থায় রাশিয়ার অংশগ্রহণ সীমিত থাকায় সেই অর্থ রাশিয়ায় পাঠানোর পথ বন্ধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সমস্যা বাংলাদেশের অনিচ্ছার কারণে নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো অর্থ গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও ঋণ পরিশোধ কাঠামোর এই জটিলতা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট সৃষ্টি করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সব প্রক্রিয়াই সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপনের পর রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এবং আইএইএর তত্ত্বাবধানে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এ বছরের মধ্যেই প্রথম ইউনিট চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’ সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD