রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন




মিলছে না সংসারের হিসাব

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩ ১১:২৯ am
বন্দর আমদানি বাণিজ্য import trade trade Export Promotion Bureau EPB Export Market বাণিজ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি export shop food ভোজ্যতেল চিনি আটা vegetable Vegetables mudi dokan bazar মুদি বাজার নিত্য পণ্য দোকান mudi dokan bazar মুদি বাজার নিত্য পণ্য দোকান romzan ডলার রোজা রমজান পণ্য ভোগ্যপণ্যের আমদানি এলসি ভোগ্যপণ্য খালাস স্থলবন্দর বাজার
file pic

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন মো. আরিফুল ইসলাম। এ বেতনের টাকা দিয়েই রাজধানীতে তাকে তিনজনের সংসার চালাতে হয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিলসহ প্রতি মাসে বাসা ভাড়া দিতে হয় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ছেলের স্কুলের বেতন দিতে হয় এক হাজার ৭৫০ টাকা। সংসারের জন্য চাল, ডাল, সবজি, তেল, সাবানের পাশাপাশি বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য কেনা এবং নিজের প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ মেটাতে হয় বাকি টাকা দিয়ে।

আরিফুল বলেন, তিনজনের সংসারে প্রতি মাসে চাল লাগে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকার। অফিসে যাতায়াতের জন্য ভাড়া লাগে দেড় হাজার টাকার মতো। বাচ্চার টিফিন খরচ মাসে এক হাজার টাকা। এছাড়া বাচ্চার জন্য দুধ, ডিমসহ অন্যান্য খাবার কেনা বাবদ মাসে লাগে ২ হাজার টাকা। কাপড় ধোয়ার পাউডার, গায়ের সাবান, শ্যাম্পু, চুলের তেল, পেস্টের জন্য খরচ আরও দেড় হাজার টাকা। অনেকটাই নির্ধারিত এসব খরচের পর মাছ, মাংস, সবজি, ডাল ও রান্নার তেল কেনাসহ অন্যান্য খরচের জন্য অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৮ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, বাজারে সবকিছুর যে দাম তাতে মাসে ৪ হাজার টাকা লেগে যায় সবজি কিনতে। বাকি ৪ হাজার টাকা দিয়ে কীভাবে পুরো মাসের মাছ, মাংস, রান্নার তেল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদসহ অন্যান্য পণ্য কিনবো? এর বাইরেও তো প্রতি মাসেই টুকটাক কিছু অন্য খরচ থাকে। ফলে সীমিত আয়ে কিছুতেই সংসারের খরচ মেলাতে পারছি না। পান, সিগারেট, চা কিছুই খাই না। তবু মাস শেষে হাতে কোনো টাকা থাকে না। এমনকি মাঝেমধ্যেই সহকর্মীদের কাছ থেকে ধারদেনা করতে হয়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এ চাকুরে আরও বলেন, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের খরচ। কিন্তু আয় তো বাড়ছে না। ফিক্সড বেতনের চাকরি করি। বাড়তি কোনো আয় নেই। প্রতি মাসেই বেতনের টাকা পেয়ে নির্ধারিত খরচের খাতগুলোর টাকা আলাদা করে ফেলি। এরপরও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলে না। মাঝেমধ্যে ছেলে ও স্ত্রী বাইরে ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় তাদের বায়না পূরণ করতে পারি না। এ নিয়ে কোনো কোনো সময় সংসারে অশান্তিও হয়। আমি কত কষ্ট করে চলি সেটা পরিবারকে বোঝাতে পারি না। প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকি।

শুধু আরিফুল ইসলাম নন, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে রাজধানীর বাসিন্দাদের অনেকেই সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক টেনেটুনে খরচ করেও মাস শেষে তাদের কোনো সঞ্চয় নেই। কেউ কেউ খরচের লাগাম টানতে কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। তাতেও সংসারের হিসাবের খাতায় স্বস্তি ফিরছে না। গত এক সপ্তাহে রাজধানীতে স্বল্প বা সীমিত বেতনের বেসরকারি চাকরিজীবী, পোশাককর্মী, রিকশাচালক, সবজি-ফল বিক্রেতা- এমন ৫০ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জীবনযাপনে টানাপোড়েনের চিত্র তুলে এনেছেন জাগো নিউজের এ প্রতিবেদক।

তাদের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসিক ২০-৩০ হাজার টাকা বেতন পান এমন অন্তত ১০ জন জানিয়েছেন, তারা কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। একই কথা জানিয়েছেন পোশাককর্মী ও রিকশা চালকেরাও। তারা বলছেন, গার্মেন্টসকর্মী ও রিকশা চালকদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন, মাসে সর্বোচ্চ দুদিন মাংস খেতে পারেন। মাছও নিয়মিত খাওয়া হয় না। বেশিরভাগ সময় ডাল-ভর্তা-ভাত খেয়েই দিন কাটে।

নিম্নআয়ের মানুষ যে কষ্টে আছে তা সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনে চোখ রাখলেও কিছুটা টের পাওয়া যায়। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ২ শতাংশ এবং খোলা আটার দাম ২৪ শতাংশ বেড়েছে। পাম অয়েলের দাম ২ শতাংশ, আলু ৩৮ শতাংশ আর এ্যাংকর ডালের দাম সাড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে।

অবশ্য পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলা, চিনি, লবণ, দুধ, ডিম, মাছ ও মাংসের দাম বেড়েছে আরও বেশি হারে। বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজ ৪৭ শতাংশ, রসুন ২২১ শতাংশ, শুকনা মরিচ ৪৮ শতাংশ, হলুদ ৪ শতাংশ, আদা ১৮৮ শতাংশ, জিরা ১৭০ শতাংশ আর লবঙ্গের দাম বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।

এছাড়া বছরের ব্যবধানে রুই মাছ ৩৩ শতাংশ, গরুর মাংস ১৫ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগি ৬ শতাংশ, কোম্পানি ভেদে গুঁড়ো দুধের দাম ৯ থেকে ১৭ শতাংশ, চিনি ৭০ শতাংশ, লবণ ১৮ শতাংশ এবং ডিমের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। টিসিবির প্রতিবেদনেই পণ্যের দাম বাড়ার এ চিত্র উঠে এসেছে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি বাড়ার অর্থ ওই হারে খরচ বেড়ে যাওয়া। অন্যভাবে বলা যায়, এক বছরে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাড়ার মানে হলো, এক বছর আগে একজন যে সেবা বা পণ্য ১০০ টাকায় কিনতেন, এখন সেই সেবা বা পণ্যের জন্য খরচ হচ্ছে ১০৯ টাকা ১ পয়সা।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তার আগের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর এপ্রিল মাসে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং মার্চে ছিল ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

রাজধানীর মধুবাগের একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন রিকশাচালক ফয়েজ আলী। তিনি বলেন, প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে খরচের টাকা বাদ দিয়ে ৭০০-৮০০ টাকা আয় হয়। বাসা ভাড়া দেওয়া লাগে ৯ হাজার টাকা। মাসে চাল লাগে ৩ হাজার টাকার। আয় যা হয় তার অর্ধেক বাসা ভাড়া ও চালের জন্য খরচ হয়ে যায়। বাকি টাকা দিয়ে অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়।

তিনি বলেন, আমরা মাছ, মাংস খুব একটা খাই না। মাসে ১-২ দিন ব্রয়লার মুরগি কিনি। মাছের অনেক দাম। ৫০০ টাকার মাছ কিনলে দুদিনের বেশি যায় না। গরুর মাংস অনেক আগেই খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। সবজি দিয়ে ভাত খাবো তারও উপায় নেই। ৫০-৬০ টাকার কমে বাজারে কোনো সবজি পাওয়া যায় না। জিনিসপত্রের যে দাম তাতে আমরা খুব কষ্টে আছি। অনেক সময় দুপুরে পানি দিয়ে শুধু একটা রুটি খেয়ে পার করে দেই।

রামপুরার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন রিতা আক্তার। তিনি বলেন, মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। এ টাকা দিয়ে কীভাবে চলি একটু চিন্তা করেন। আমরা চারজন মিলে একটা বাসায় থাকি। প্রতি মাসে বাসা ভাড়া দেওয়া লাগে ১ হাজার ৫০০ টাকা। গ্রামে মা আছেন। মায়ের জন্য মাসে দুই হাজার টাকা পাঠাতে হয়। এখন এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনতে লাগে ১০০ টাকা। মাছ, তেল, সবজিরও অনেক দাম। কোনো কোনো মাসে একদিনও মাংস খাওয়া হয় না। কোনো রকমে ডাল-ভর্তা-ভাত খেয়ে দিন পার করছি। এভাবেই আমাদের দিন চলে যাচ্ছে।

মতিঝিলের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন যাত্রাবাড়ীর মো. নাসিম। তিনি বলেন, মাসে যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে খুব টানাটানি করে সংসার চালাতে হয়। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, সাবান, শ্যাম্পু, কাপড় ধোয়ার পাউডার থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। এক কেজি টমেটো ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য সবজির দামও অনেক বেশি। মাছের কেজি ৩৫০-৪০০ টাকা। কোনোভাবেই খরচের লাগাম টানতে পারছি না। জুন মাসে এক সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলাম। এ মাসেও কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। যে বেতন পাই তা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না।

মতিঝিলের একটি বিমা কোম্পানিতে চাকরি করা আরিফুল ইসলাম বলেন, ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে যে বাজার হয়, তা দিয়ে দুদিনের বেশি চলে না। চাল, আটা, তেল, চিনি সবকিছুর অস্বাভাবিক দাম। কোনো কিছুর দাম কমার লক্ষণ দেখছি না। বরং মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের মত কম টাকার বেতনে যারা চাকরি করেন, তারা বর্তমান সময়ে খুব কষ্টে আছেন। খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েও খরচ কমানো যাচ্ছে না।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD