ডলার সংকটের এ সময়ে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ দ্রুত কমছে। গত এক বছরে বিদেশি ঋণ প্রায় ৪১০ কোটি ডলার বা ৩০ শতাংশ কমে জুন শেষে এক হাজার ৩৬৬ কোটি ডলারে নেমেছে। গত বছরের জুনে যা এক হাজার ৭৭৬ কোটি ডলার ছিল। গত ডিসেম্বর শেষে ছিল এক হাজার ৬৪২ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি এসব ঋণ নেন। সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিট নামে যা পরিচিত। স্বল্পমেয়াদি এই ঋণ সব চেয়ে দ্রুত বেড়েছিল করোনার মধ্যে। ২০২০ সাল শেষে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ ছিল ৯১৩ কোটি ডলার। এক বছরে আরও ৬৩৩ কোটি ডলার বা ৬৯ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়ে ২০২১ সাল শেষে হয় এক হাজার ৫৪৬ কোটি ডলার। এরপর আরও বেড়ে যায়। তবে ডলার সংকট শুরুর পর গত বছরের জুনের পর তা কমছে।
বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি এই বিদেশি ঋণের বাইরে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে মেয়াদি ঋণ নেন উদ্যোক্তারা। গত জুন পর্যন্ত মেয়াদি ঋণের তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবে গত মার্চ প্রান্তিক পর্যন্ত মেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১০ কোটি ডলার। সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৫৩ কোটি ডলার। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধেও একটা চাপ তৈরি হয়েছে। যে কারণে সরকার বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন উপায়ে আমদানি কমানো এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধির পরও ডলার বাজারে সংকটের মূল কারণ ঋণ পরিশোধের চাপ। বাজার ঠিক রাখতে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে আরও ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত অর্থবছর বিক্রি করা হয় রেকর্ড এক হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এখন আইএমএফের হিসাব পদ্ধতির আলোকে ২৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে ২৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে যা সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল।
জানা গেছে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ কমার প্রধান কারণ সুদহার ও বিনিময় হার। বর্তমানে বিদেশি ঋণে সুদ গুনতে হচ্ছে ৯ শতাংশের বেশি। গত বছরের এ সময়ে যা ৩ শতাংশের নিচে ছিল। আবার গত বছরের শুরুর তুলনায় এখন প্রতি ডলার কিনতে ২৫ টাকার মতো বেশি খরচ করতে হচ্ছে। বিনিময় হার বা সুদহার এ পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকবে কিনা তা কেউ বলতে পারছে না। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স সম্প্রতি বাংলাদেশের কান্ট্রি রেটিং কমিয়েছে। এসঅ্যান্ডপির রেটিং কমানোর আভাস দিয়েছে। ফলে বেশি সুদে বিদেশি ঋণ পাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে এখন কঠিন হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অনেক ব্যাংক বাংলাদেশি কোনো কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট লাইন বা ঋণসীমা কমিয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, করোনার শুরুর দিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা ছিল। তখন বিদেশি ঋণের সুদহার অনেক কমে যায়। ওই সময়ে ডলারের প্রয়োজনীয়তাও কম ছিল। তবে কোনো ধরনের হিসাব ছাড়াই সাময়িক লাভের জন্য এখানে ঋণ বাড়ানো হয়। ওই সময় ঋণ বাড়ানোর ফলে রিজার্ভ দ্রুত বেড়েছিল। ২০২০ সালের শুরুতে রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। দ্রুত বেড়ে ২০২১ সালের আগস্টে রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।