অত্যাচার, অনাচার আর পাপাচারের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় যেসব জাতিকে খোদায়ি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের মধ্যে আল্লাহর নবি হজরত লুত (আ.)-এর জাতি অন্যতম।
মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা ও ব্যভিচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করেনি। সবশেষ নতুন যে পাপটি তারা আবিষ্কার করে সেটি হলো সমকামিতা। এটি করে প্রকাশ্যে আনন্দ-উল্লাস করত তারা।
আল্লাহ বলেন, ‘আর লুতকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম। আমি তাকে এমন এক জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম, যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজে লিপ্ত ছিল। তারা ছিল এক মন্দ ও পাপাচারী কওম। আর আমি তাকে আমার রহমতের মধ্যে শামিল করে নিয়েছিলাম। সে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা আম্বিয়া: আয়াত ৭৪-৭৫)।
সূরা আন নামলে লুত নবির জাতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- ‘স্মরণ করো লুতের কথা, তিনি তার জাতিকে বলেছিলেন, তোমরা কেন অশ্লীল কাজ করছ? অথচ-এর পরিণতির কথা তোমরা অবগত আছ! তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়। উত্তরে তার কওম শুধু এ কথাটিই বলল, লুত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়। অতঃপর তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম তার স্ত্রী ছাড়া। কেননা তার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম। আর তাদের ওপর বর্ষণ করেছিলাম মুষলধারে বৃষ্টি। সেই সতর্ককৃতদের ওপর কতই না মারাত্মক ছিল সে বৃষ্টি।’ (সূরা আন নামল: আয়াত ৫৪-৫৮)।
তাফসিরকারকরা বলেন, সমকামিতার মহাঅপরাধে লুত (আ.)-এর জাতির ওপর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাপ্রলয় নেমে আসে। এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে। পাশাপাশি আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ওই মহাপ্রলয়ের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি।
লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসস্থলটি বর্তমানে ডেড সি বা মৃত সাগর নামে পরিচিত। ফিলিস্তিন ও জর্দান নদীর মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল অঞ্চলজুড়ে নদীর রূপ ধারণ করে আছে এটি। এতে কোনো ধরনের জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না।
হযরত লুত (আ.) এবং মৃত সাগর!
পোর্ট “ইলাত”, ইসরায়েলের লোহিত সাগরের অংশ গালফ অব আকাবা’তে। ইলাত যেতে Starit of Turan, বা তুরান প্রণালী পার হয়ে যেতে হয়। অসম্ভব স্বচ্ছ আর দূষণমুক্ত টলটলে পানির কারণে এখানে মোটামুটি গভীর তলদেশ পর্যন্ত আর অদ্ভুত সুন্দর সামুদ্রিক পরিবেশ জাহাজের ডেক হতেই সরাসরি দেখা যায়।
ইলাত টুরিস্ট স্পট হিসেবেও বেশ প্রসিদ্ধ। বিচ, নাইট লাইফ, সাবমেরিনে সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণ ইত্যাদির জন্য প্রচুর ইউরোপিয়ান টুরিস্ট আসে এখানে। আরেকটা আকর্ষণ হলো ডেড সি বা মৃত সাগর-এর লবণাক্ততা শতকরা ৩০ ভাগ এবং এটি সমুদ্রের পানির চাইতে ৮.৬ গুণ বেশি লবণাক্ত। সেখানকার লবণ দিয়ে তৈরি ক্রিম চামড়ার যত্নে বেশ কার্যকরী। বেগুনি রশ্মি কম হওয়াতে এখানে সূর্যস্নানও বেশ উপকারী।
গালফ অব আকাবার বিপরীত দিকে জর্দানের বিচ। অর্থাৎ ইলাত বিচের বিপরীতে অল্প দূরত্বেই জর্ডান বিচ। কিন্তু জর্ডান বিচে সব পোশাক পরা ছেলে মেয়ে আর ইলাত বিচে সব বিকিনি পরা মেয়েরা। জাহাজের ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার বললো, জানেন জর্ডান বিচে সবচেয়ে কি বেশি বিক্রি হয়? একটু অপেক্ষা করে উত্তরটা বলে দিলো- আমি শিউর দূরবীন!
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক বেশধারী এবং মুসলিম নামধারী লোকজনই ইদানীং “সমকামিতা”কে স্বীকৃতি এবং উৎসাহ দিচ্ছে। এরা ভিডিও তৈরি করেও ফলোয়ারদের মধ্যে বিপথে যাবার জন্য মোটিভেশন দিয়ে বেড়াচ্ছে।
মাঝখানে টেন মিনিটস স্কুল পর্যন্ত সমকামিতাকে প্রমোট করছিল। এরা লিভ টুগেদার, গে-লেসবিয়ান রিলেশন ইত্যাদি ইস্যুতে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে-এমন ভিডিও কন্টেন্ট বানাচ্ছিল। পরবর্তীতে মানুষের প্রতিবাদের মুখে অবস্থান পালটে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
আল্লাহ প্রেরিত নবী হযরত লূত (আ.) এর পিতার নাম ছিল হারান। লূত (আ.) ছিলেন ইব্রাহীম (আ.) এর ভাইয়ের ছেলে। ভাতিজা লূত (আ.) ছোটবেলা থেকেই ইব্রাহীম (আ.) এর সাহচর্যে বড় হন। এবং ইব্রাহীম (আ.) এর আহবানে সাড়া দিয়ে সঠিক ধর্ম গ্রহণ করেন ও সেই সত্য ধর্ম প্রচার করার জন্য মাতৃভূমি ইরাক ত্যাগ করে হিজরত করে মিশরে চলে আসেন। তিনি ইব্রাহীম (আ.) এর যুগেই নবুয়ত প্রাপ্ত হন।
মিশরে ইব্রাহীম (আ.) এর সাথে লূত (আ.) কিছুদিন কাজ করার পর ইব্রাহীম (আ.) মিসর হতে সিরিয়ার ফিলিস্তিনে, আর লূত (আ.) জর্দান রাজ্য বা ট্রান্সজর্দান এলাকায় চলে আসেন। এটি বর্তমানে মরু সাগরের নিকট সডম ও গমোরা নগর হিসাবে খ্যাত। এখানে সাদ্দুম নামে এক বস্তি ছিল। সে বস্তি এবং আশেপাশের আরো কিছু এলাকায় লূত (আ.) সত্য ধর্মের প্রচার করতেন।
লূত (আ.) যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, তারা জঘন্য রকমের খারাপ স্বভাবের ছিল। তারা কুফর, শিরক ইত্যাদির সাথে সাথে জুলুম, অত্যাচারে লিপ্ত ছিল। পথিক, বিদেশি আগুন্তক, বণিক ও ব্যবসায়ীদের কাছ হতে লুন্ঠণ করতো। এছাড়া তারা এমন এক কদর্য ও নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত ছিল, যা তাদের পূর্বে বিশ্ব জগতের আর কেউই করেনি। তারা মাঠে ঘাটে, রাস্তায়, মাহফিল, মজলিসে বিনা দ্বিধায় পুরুষদের সাথে কুকর্মে লিপ্ত হতো।
হযরত লূত (আ.) এসব জঘন্য দুস্কর্মের জন্য দেশবাসীকে বিভিন্নভাবে বোঝালেন। তারা বুঝলো না। তারপর তিরস্কার করলেন, কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত করলো না। তিনি তার দেশবাসীকে বললেন, নিশ্চয়ই তোমরা এমন এক নির্লজ্জ ও কুৎসিৎ কাজে লিপ্ত যা তোমাদের পূর্বে বিশ্ব জগতের কেউই করেনি। ছেলে ও পুরুষদের সাথে কুকর্ম, ডাকাতি এবং প্রকাশ্য মজলিশে কুকর্ম, তোমরা কি এসবে ডুবে থাকবে? দেশবাসী উত্তর করলো, ‘তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে আমাদের উপর গজব নিয়ে আসো।’ লূত (আ.) আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন, ‘হে পরওয়ারদেগার, আমাকে এই দুষ্টদের মোকাবিলায় সাহায্য করুন।
তখন আল্লাহ দু’জন ফেরেশতা, মেহমানরুপে তার গৃহে পাঠালেন। ফেরেশতারা অত্যন্ত সুদর্শন বালকরূপে এলেন। লূত (আ.) বাড়ি এসে, এত সুদর্শন বিদেশি মেহমান দেখে, দেশবাসীর চরিত্র ও অভ্যাসের কথা মনে করে, অত্যন্ত ভীত হয়ে গেলেন। তার স্ত্রী ছিল কাফের। সে লূত (আ.) এর সাথে অত্যন্ত অসহযোগিতা করতো। সে যেয়ে দেশবাসীকে এসব সুদর্শন মেহমানদের খবর দিয়ে আসলো। দেশবাসী মাতালের মতো ছুটে আসতে লাগলো। লূত (আ.) অস্থির হয়ে পড়লেন আর এদিকে গুন্ডারাও এসে উপস্থিত হলো।
লূত (আ.) মেহমানদের রক্ষা করার উপায় হিসেবে নিজ কন্যাদেরকে গুন্ডাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু দুশ্চরিত্র ঐ সব লোকসমূহ সব কিছু অগ্রাহ্য করলো। এবং বললো আপনিতো জানেন, আমরা কি চাই! লূত (আ.) বিব্রত অবস্থায় পড়লেন। কিভাবে রক্ষা পাবেন, তাই চিন্তা করতে লাগলেন। তখন ফেরেশতারা গোপনে লূত (আ.) এর কাছে নিজেদের পরিচয় দিলেন। এবং পরামর্শ দিলেন যে, আপনি আপনার পরিজন ও সঙ্গীদেরকে নিয়ে রাত্রেই এই দেশ ত্যাগ করবেন। ভোর হতে না হতেই এই দেশের উপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
লূত (আ.) ফেরেশতাদের কথানুযায়ী তার অনুসারীদের সাথে নিয়ে রাতেই শহরের বাইরে চলে গেলেন, সিরিয়ার উদ্দেশ্যে। অবশ্য লূত (আ.) এর স্ত্রী ওখানেই রয়ে গেলেন। ভোরে এই এলাকায় ভয়ংকর ভূমিকম্প, তর্জন-গর্জন আরম্ভ হলো। উপর হতে প্রস্তর বর্ষণ হতে লাগলো। সমগ্র দেশের উপর সজোরে নিক্ষেপ হতে লাগলো। প্রভাতেই সমগ্র দেশ ধ্বংস হয়ে ভূপৃষ্ট হতে পাপিষ্টদের চিহ্ন চিরতরে মুছে গেলো। শুধু রইলো কুৎসিৎ কলঙ্কের কালিমা রেখা। সবকিছু ধ্বংস হয়ে সম্পূর্ণ এলাকা সাগরে পরিণত হলো, যা আজও জর্দানের মানচিত্রে বিদ্যমান আছে। আল্লাহর গজবে পতিত অভিশপ্ত এই এলাকাটি বাংলায় মৃত সাগর, ইংরেজিতে ও আরবীতে ‘বাহরে মাইয়েত’ নামে পরিচিত। এটি দৈঘ্যে ৭৭ কিলোমিটার (প্রায় ৫০ মাইল), প্রস্থে ১২ কিলোমিটারের কিছু উর্ধ্বে (প্রায় ৯ মাইল), গভীরতায় ৪০০ মিটার (প্রায় কোয়াটার মাইল)। পুরাতন ইতিহাসে এটি ‘লূত সাগর’ নামে আখ্যায়িত।
LGBT আন্দোলন নিয়ে কুরআন হাদিসের কিছু রেফারেন্স –
আল-কোরআনে সমকামিতা সম্পূর্ণ হারাম। এমনকি স্বাভাবিক ব্যভিচারের চাইতেও নিকৃষ্ট।
“এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বললো- তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ। অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বাঁচিয়ে দিলাম, কিন্তু তার স্ত্রী। সে তাদের মধ্যেই রয়ে গেলো, যারা রয়ে গিয়েছিল। আমি তাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।
সূরা আরাফ: ৮১-৮৩।
“সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” সূরা শুয়ারা: ১৬৫-১৬৬।
“আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের কাছে আগমন করলো, তখন তারা বললো- আমরা লুতের জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করবো। নিশ্চয় এর অধিবাসীরা অপরাধী।
সে বললো- এই জনপদে তো লূতও রয়েছে। তারা বললো- সেখানে কে আছে, তা আমরা ভালো জানি। আমরা অবশ্যই তাকে ও তার পরিবারবর্গকে রক্ষা করব তার স্ত্রী ব্যতীত; সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে। আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের উপর আকাশ থেকে আযাব নাজিল করবো তাদের পাপাচারের কারণে।
আমি বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি। সূরা আনকাবুত: ৩১-৩৫।
হাদিস
“ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুল (স) বলেছেন- তোমরা যদি কাউকে পাও যে লুতের সম্প্রদায় যা করতো তা করছে, তবে হত্যা করো যে করছে তাকে আর যাকে করা হচ্ছে তাকেও।”
(আবু দাউদ: ৩৮:৪৪৪৭)