ইতিকাফের গুরুত ও ফজিলত:
ইতিকাফের অর্থ: আটকে থাকা, আবদ্ধ থাকা, কোনো স্থানে অবস্থান করা। আর শরিয়াতের পরিভাষায় ইবাদাতের উদ্দেশে মাসজিদে বিশেষ অবস্থান গ্রহণ করা।
আল্লাহ রাব্বুল আরশিল আযীম বলেন: ‘সেই সময়কে স্মরণ কর যখন কাবাগৃহকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তা স্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম, তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকূ ও সাজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম’। [সূরা ২, আল বাকারা-১২৫]
“তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের (তোমাদের স্ত্রীর) সঙ্গে সংগত (মিলিত) হয়ো না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না”। [সূরা ২, আল বাকারা-১৮৭]
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন: তোমরা রামাযান মাসের শেষ দশ দিন লাইলাতুল কাদর তালাশ কর।
[বুখারী/১৮৮৮-আয়িশা (রাঃ), মুসলিম/২৬৫০]
২. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তার মৃত্যু পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তার সহধর্মিনীগণও ইতিকাফ করতেন।
[বুখারী/১৮৯৪, তিরমিযী/৭৮৮, মুসলিম/২৬৫১]
৩. প্রাকৃতিক প্রয়োজন (প্রস্রাব, পায়খানা, গোসল ইত্যাদি) ছাড়া ইতিকাফকারী (তার) ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না।
[বুখারী/অনুচ্ছেদ-৯২৪, বুখারী/১৮৯৭]
৪. উমার (রা.) নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন: ‘আমি জাহিলিয়াতের যুগে একরাত মাসজিদে হারামে ইতিকাফ করার মানত করেছিলাম’। তিনি (উত্তরে) বললেন: ‘আপনার মানত পুরা করুন’ (অর্থাৎ আপনি ইতিকাফ করুন এবং সিয়াম পালন করুন)। [বুখারী/১৮৯৯, আবূ দাউদ/২৪৬৬]
৫. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রামাযান মাসে ইতিকাফ করতেন। (রামাযান মাসের বিশ তারিখে) ফাজরের সলাত শেষে ইতিকাফের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করতেন।
[মুসলিম/২৬৫২, ইবন মাজাহ/১৭৭১, বুখারী/১৯০০, ১৯০৩, ১৯০৮, আবূ দাউদ/২৪৫৬]
৬. রমজান মাসের শেষ দশ দিন শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা রাত জেগে থাকতেন, নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগাতেন এবং তিনি নিজেও ইবাদাতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন। [মুসলিম/২৬৫৪-আয়িশা (রাঃ), ইবন মাজাহ/১৭৬৮, আবূ দাউদ/১৩৭৬]
৭. ইতিকাফকারীর জন্য সুন্নাত এই যে, সে যেন কোনো রোগীর পরিচর্যার জন্য গমন না করে, জানাযার সালাতে শরীক না হয়, স্ত্রীকে স্পর্শ না করে এবং তার সাথে মিলিত না হয়। আর সে যেন বিশেষ প্রয়োজন (প্রস্রাব ও পায়খানা) ব্যতীত মাসজিদ হতে বের না হয়। সিয়াম (রোযা) ব্যতীত ইতিকাফ নেই। জামে মাসজিদ ব্যতীত ইতিকাফ শুদ্ধ নয়।
[আবূ দাউদ/২৪৬৫-আয়িশা (রা.)]
৮. উবাই ইব্ন কাব (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযান মাসের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। কিন্ত বিশেষ কারণে তিনি এক বছর ইতিকাফ করতে সক্ষম হননি। এরপর পরবর্তী বছর এলে তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছেন।
[আবূ দাউদ/২৪৫৫]
৯. ইতিকাফ অবস্থায় স্বামীর সঙ্গে স্ত্রী সাক্ষাত করতে পারবে। [বুখারী/১৯০৫]
১০. আয়িশা (রা.) ঋতুবতী অবস্থায় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা আঁচড়িয়ে দিতেন অথচ এ সময় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মাসজিদে ইতিকাফ রত। আর আয়িশা (রা.) ছিলেন তারই কক্ষে (ঘর) থেকেই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা আঁচড়িয়ে দিতেন) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মাথা জানালা দিয়ে আয়িশার (রা.) দিকে ঝুকিয়ে দিতেন।
[বুখারী/১৯১৩, মুসলিম/৫৭৭]
১১. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদে একটি তুর্কী তাবুর মধ্যে ইতিকাফে বসেন, যার জানালায় টাঙ্গানো ছিল চাটাইয়ের টুকরা। রাবী বলেন: তিনি তার হাত দিয়ে চাটাইটি সরিয়ে বেষ্টনীর পাশে রাখেন, অতঃপর মাথা বের করে লোকদের সাথে কথা বলেন। [ইবন মাজাহ/১৭৭৫]
লাইলাতুল কাদরের গুরুত ও ফজিলাত:
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে, আর মহিমান্বিত রাত সম্বন্ধে তুমি জান কি? মহিমান্বিত রাত সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রাতে মালাইকা ও রূহ্ (জিবরাঈল আমীন) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রাত ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত’।
[সূরা ৯৭, আল কাদর ১-৫]
১. যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদর অনুসন্ধান করতে চায় সে যেন তা (রামাযানের) শেষ দশকে অনুসন্ধান করে।
[বুখারী/১০৮৪]
২. যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদর ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জাগবে তার পিছনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সাওয়াবের আশায় রামাযান মাসে সিয়াম পালন করবে তারও অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। [বুখারী/১৭৭৫, ১৮৮২, আবূ দাউদ/১৩৭২]
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমরা রামাযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কাদ্রের সন্ধান কর। [বুখারী/১৮৮৫-আয়িশা (রা.), বুখারী/১০৮৪, ১৮৮৬, মুসলিম/২৬৩৩, তিরমিযী/৭৯০]
৪. আয়িশা (রা.) বলেছেন : যখন (রামাযানের শেষ) দশ দিন এসে যেত, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরনের কাপড় শক্ত করে বাঁধতেন (কঠোর ইবাদাতের প্রস্তুতি নিতেন), রাত জাগরণ করতেন এবং পরিবারের লোকজনকেও জাগাতেন।
[বুখারী/১৮৯২]
৫. লাইলাতুল কাদরের ফজিলাত পূর্ণ দু‘আ:
اَللهم إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ.
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ কর, অতএব আমাকেও ক্ষমা কর’।
[ইব্ন মাজাহ/৩৮৫০]
সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে কি কি দিতে হবে:
১. প্রতিটি আযাদ-গোলাম, নারী-পুরুষ, প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতরস্বরূপ খেজুর হোক, যব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ধার্য করেছেন এবং ঈদের সালাতে যাবার পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়াছেন। [বুখারী/১৪১০, ১৪১৯, ইব্ন মাজাহ/১৭৫৫, নাসাঈ/২৫১৩, মুসলিম/২১৪৭, ২১৪৮, তিরমিযী/৬৭২]
২. আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেছেন: নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ঈদের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য সাদাকা দিতাম। তিনি আরও বলেন: ‘আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, শুষ্ক আঙ্গুর, খেজুর ও পনির’।
[বুখারী/১৪১৭, নাসাঈ/২৫১৪]
৩. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতদিন আমাদের মাঝে জীবিত ছিলেন ততদিন আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা’ খাদ্য, এক সা’ খেজুর, এক সা’ যব, এক সা’ পনির অথবা এক সা’ কিশমিশ আদায় করতাম। আমরা দীর্ঘদিন যাবত এ নিয়ম পালন করে আসছিলাম। অবশেষে মু‘আবিয়া (রা.) মাদীনায় আমাদের নিকট আসেন। এ সময় তিনি লোকদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন: আমি তো শ্যাম দেশের উত্তম গমের দুই মুদ (অর্থাৎ অর্ধ সা) পরিমাণকে এখানকার এক সা’ বরাবর মনে করি। তখন লোকেরা এ কথাটিই গ্রহণ করে নিল। আবূ সাঈদ (রা.) বলেছেন: আমি কিন্তু সারা জীবন ঐ হিসাবেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে যাবো, যে হিসেবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আদায় করতাম।
[মুসলিম/২১৫৩, ইব্ন মাজাহ/১৮২৯, তিরমিযী/৬৭০]
[** মাদীনার ১ সা’=৪ মুদ, ১ মুদ=০.৬৬৭ কেজি। ১ সা’=২.৬৭ কেজি (প্রায়ই)]
৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: সাদাকাতুল ফিতর সিয়ামকে (রোযাকে) অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা ও অসদাচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশে এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য ফারয করেছেন। যে ব্যক্তি তা (ঈদুল ফিতরের) সালাতের পূর্বে দান করে তা কবূল হওয়া যাকাত হিসেবে গণ্য। আর যে ব্যক্তি তা সালাতের পরে পরিশোধ করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-খাইরাতের অনুরূপ হিসেবে গণ্য। [আবূ দাউদ/১৬০৯, ইব্ন মাজাহ/১৮২৭]
সাদাকাতুল ফিতর রামাযান মাসের কোন সময় দিতে হয়:
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের সালাতের উদ্দেশে যাত্রা করার পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন।
[বুখারী/১৪১৬, মুসলিম/২১৫৭, ইব্ন মাজাহ/১৭৫৫, তিরমিযী/৬৭৪,]
২. ঈদের এক অথবা দু’দিন পূর্বেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যেতে পারে।
[বুখারী/১৪১৮, আবূ দাউদ/১৬১০]
[ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত আল কুরআন ও হাদীস গ্রন্থ হতে সংকলিত]
IFM desk