রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন




জোরপূর্বক একীভূতকরণ ব্যাংকিং খাতে দায়মুক্তির নতুন মুখোশ: টিআইবি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪ ৯:৪৫ pm
transparency international bangladesh tib ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি
file pic

ব্যাংক একীভূতকরণে আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না মনে করে বিবৃতি দিয়েছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মানায় প্রস্তাবিত একীভূতকরণ প্রক্রিয়াগুলো স্থগিত করতে বলেছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে, একীভূতকরণে স্বতঃস্ফূর্ত এর বদলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্বেচ্ছাচারীভাবে চাপিয়ে’ দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বল ব্যাংকগুলো রক্ষার নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূতকরণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে, যা আর্থিক খাতে সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু সংবেদনশীল ও জটিল এই কাজটি করতে আর্ন্তজাতিকভাবে অনুসৃত মানদণ্ড ও রীতিনীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজের ঘোষিত নীতিমালা না মেনে তড়িঘড়ি করা হচ্ছে।

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যাংক একীভূতকরণের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে আড়াই বছরের রোডম্যাপ ও প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সেখানে বলা হয়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলো নিজেরা চাইলে স্বেচ্ছায় একীভূত হতে পারবে। এসময়ের মধ্যে না হলে ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত দিয়ে একীভূতকরণ করতে পারবে। এ জন্য দুর্বল ব্যাংক শ্রেনিকরণ করা হবে পিসিএ এর মাধ্যমে। এসব ঘোষণার পরে এ পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবল পাঁচটির সঙ্গে দুর্বল পাচ ব্যাংক একীভূত হওয়া নিয়ে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে পদ্মা ও এক্সিম ব্যাংক চুক্তিতে গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব একীভূত হওয়াকে স্বেচ্ছায় বললেও ব্যাংক খাতে ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। সেই পক্ষে মতামত দিয়ে টিআইবি বলছে, স্বেচ্ছাচারীভাবে চাপিয়ে দেওয়া কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণের ঘোষণা এবং এ প্রক্রিয়ায় থাকা ভালো ব্যাংকগুলোর অস্বস্তি, একীভূত হতে কোনো কোনো দূর্বল ব্যাংকের অনীহা, সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে শঙ্কা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা গভীরতর করেছে। যা একীভূতকরণের পুরো প্রক্রিয়াটিকে শুরুর আগেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

টিআইবি মনে করে, প্রস্তাবিত একীভূতরকরণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণে জর্জরিত দুর্বল ব্যাংকের মন্দ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে যে ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করা হয়েছে, তা সংকটের মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে ঋণ খেলাপী ও জালিয়াতির জন্য দায়ী মহলকে ‘দায়মুক্তি’ প্রদানের নামান্তর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত একীভূতকরণ নীতিমালা অনুযায়ী, যে কোনো দুর্বল ব্যাংক চলতি বছরের মধ্যে স্বেচ্ছায় একীভূত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশপূর্বক নিজস্ব সম্পদ ও দায়-দেনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়ন করে প্রকাশ করার কথা। যা বিবেচনায় নিয়ে সবল কোনো ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকটিকে স্বেচ্ছায় একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জোরপূর্বক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন-গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একটি দুর্বল ব্যাংক ছাড়া কোনো ব্যাংকই নিজ উদ্যোগে একীভূত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি, আবার এ প্রক্রিয়ায় নাম আসা সবল ব্যাংকগুলো স্বীয় উদ্যোগে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এতে যুক্ত হতে সম্মত হয়েছে তাও নয়। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি প্রথম থেকেই স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা ঘোষিত নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, এছাড়া দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া আপাত সবল ব্যাংকের ঘাড়ে একীভূতকরণের নামে ঋণখেলাপি ও জালিয়াতির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতোটুকু যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যা ঘটছে তা ক্যান্সার চিকিৎসায় প্যারাসিটামল প্রয়োগের নামান্তর। একীভূতকরণের নামে একদিকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও জালিয়াতির জন্য যারা দায়ী তাদের যেমন সুরক্ষা দিয়ে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতিকে গভীরতর করা হচ্ছে, অন্যদিকে সবল ব্যাংকগুলোর সাফল্যের পরিণামে খারাপ ব্যাংক হজম করিয়ে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চলছে।

দুর্বল ব্যাংককে বাঁচানোর এই প্রক্রিয়া হিতে বিপরীত হবে কি-না সে বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, একীভূতকরণের আলোচনায় সরকারি-সরকারি, বেসরকারি-সরকারি এবং বেসরকারি-বেসরকারি তিন ধরনের ব্যাংকই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন বিবেচনায় এই ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একীভূত করার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, কিংবা কোন সবল ব্যাংকের সঙ্গে কোন দুর্বল ব্যাংক একীভূত হবে, তা কিভাবে ঠিক করা হয়েছে- তাও স্পষ্ট নয়।

একীভূতকরণ নীতিমালায় দুর্বল ব্যাংকের পরিচালকদের পাঁচ বছর পর পুনরায় একীভূত হওয়া ব্যাংকের পর্ষদে ফেরত আসার সুযোগের সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

তিনি বলেন, এ বিধান দুর্বল ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির বদলে পুরস্কৃত করা এবং এক ধরনের দায়মুক্তি দেবার বিধান। পাশাপাশি, দুর্বল ব্যাংকের নিরীক্ষাকালে নতুন কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির চিত্র উঠে এলে সে বিষয় গোপন রাখার যে বিধান নীতিমালায় রাখা হয়েছে, তা শুধু আর্থিক অনিয়মের চিত্রকেই ধামাচাপা দেবে না, একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হবে। যা এক কথায় অন্যায়কে সুরক্ষা দেওয়ার শামিল।

এভাবে একীভূতকরণের নামে যা ঘটছে, তা হতাশাজনক এবং ঋণ খেলাপিদের হাতে ব্যাংকিং খাতের অব্যাহত জিম্মিদশার পরিচায়ক বলে জানিয়েছে টিআইবি।

নীতিমালা অনুযায়ী একীভূত দুর্বল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি কিনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে জনগণের অর্থে ঋণ খেলাপিদের আরো এক দফা দায়মুক্তি দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে বলে মনে করছে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

টিআইবি মনে করে, প্রত্যাশিত ফল পেতে সংশ্লিষ্ট খাতে সুখ্যাতিসম্পন্ন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞগণের মতামতের ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD