রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন




রাতের আতঙ্ক হাতিরঝিল

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪ ৫:২২ pm
hatirjeel Hatirjheel হাতিরঝিল
file pic

দিনের সৌন্দর্য হাতিরঝিল রাতে যেনো আতঙ্কের। রাতের বেলার স্বল্প আলো ও গাছের ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালের অন্ধকার আতঙ্ক হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জন্য। অপর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরার ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীদের অভাবে হাতিরঝিলের বিভিন্ন স্পটে প্রতিনিয়তই বসছে মাদকসেবীদের আড্ডা।

ঘটছে ছিনতাই, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং সদস্যদের সংঘর্ষের মতো ঘটনা। এলাকাটি থেকে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শতাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। রাতের হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায়ও নিহতের সংখ্যা কম নয়। ঘটেছে আত্মহত্যার মতো ঘটনা। সব মিলে রাতের আলো-আঁধারির হাতিরঝিল এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে মানুষের কাছে।

সরজমিন দেখা গেছে, হাতিরঝিলের সড়ক ও উড়ালসড়কে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও অনেক স্থানেই বাতি জ্বলে না। উড়ালসড়কগুলোতে রাতের বেলাই থাকে ভুতুড়ে অন্ধকার। সড়কগুলোতে তেমন কোনো পুলিশি টহলও চোখে পড়ে না। লেকের অধিকাংশ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা অনেক উচ্চতায়, কোনোটা আবার সচল নেই।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতিরঝিল চলে যায় ভবঘুরে, ছিনতাইকারী, মাদকসেবীসহ নানা অপরাধীর দখলে। প্রায়ই ঘুরতে যাওয়া মানুষ ও পথচারীদের আটকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়া হয়। হকাররা আবার দ্বিগুণ দাম চেয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে তর্কবিতর্কেও জড়ায়। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় কাওরান বাজার হয়ে হাতিরঝিলে প্রবেশ করার পর দেখা যায়, কিছু যান চলাচল করছে। লেকের পাশে গাছের নিচে কয়েকজন নারী-পুরুষ ঘোরাঘুরি করছিলেন। তবে প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে কোনো পুলিশের গাড়ি দেখা যায়নি।

প্রতিটি উড়াল সড়কে উঠতে নামতে স্পিডব্রেকার থাকলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। পুরো রিং রোডের কিছু কিছু জায়গায় আলো জ্বললেও অনেক স্থানেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাস্তা দিয়ে সজোরে গাড়ি চলে যাচ্ছে। চা বিক্রেতা কিশোর আলম জানায়, বাইরে থেকে আসা পোলা-মাইয়ারা আড্ডা দিলে হিজড়াদের উৎপাত বেড়ে যায়। টাকা না দিলে লাঞ্ছিত হতে হয়। কয়টা পর্যন্ত হাতিরঝিলে চা বিক্রি করা হয়, জানতে চাইলে আলম মিয়া বলে, রাত ১১টার পর থাকি না।

এখানে থাকলে পোলাপান আইসা টাকা-পয়সা সব কাইড়া নিয়া যায়। পুলিশকে জানালে উল্টো বকাঝকা করে। পুলিশ বলে, এখানে চা বিক্রির অনুমতি দিছে কে? পলাশ সিকদার নামে বাংলামোটর থেকে হাতিরঝিল হয়ে নিয়মিত বনশ্রী চলাচলকারী এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন আমি আমার চাকরির সুবাদে এই হাতিরঝিল হয়ে যাওয়া-আসা করি। প্রাকৃতিক পরিবেশে উপভোগের পাশাপশি আমার সময়ও বাঁচে। তবে রাতের বেলায় একটু ভয় লাগে। রাস্তার বেশির ভাগই অন্ধকার থাকে। এরপর আবার গাছের ঝোপ-জঙ্গল। পুলিশের উপস্থিতিও তেমন দেখা যায় না।

মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও তারা সকলে এক জায়গায় গুচ্ছ আকারে থাকেন। সব রাস্তায় থাকে না। তিনি বলেন, রাতের বেলা হাতিরঝিলের বেশ কয়েকটি স্পটেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। আর কিছুদিন পর পরই শোনা যায় লাশ ভেসে উঠেছে। নাফিজা রহমান নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, শুক্রবার রাতে বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে হাতিরঝিল হয়ে রামপুরার বাসায় ফিরছিলেন তারা দুজন। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বেগুনবাড়ি অংশের সিদ্দিক মাস্টারের ঢালে আসার পর দুই ব্যক্তি তাদের মোটরসাইকেল থামান। তারপর কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন এসব প্রশ্ন শুরু করেন। একপর্যায়ে আমাদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

আমাদের সঙ্গে থাকা পেছন থেকে আরও দুটি মোটরসাইকেল চলে আসায় তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়। হাতিরঝিলের সিকিউরিটি গার্ড ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মধুবাগ ও মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় দু’টি ব্রিজের পাশাপাশি চারটি ওভারব্রিজ রয়েছে। মধুবাগ এলাকায় রয়েছে বেগুনবাড়ি ও মধুবাগ ওভারব্রিজ। মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় রয়েছে আড়ং ও মহানগর সাইড ওভারব্রিজ। এই চারটি ওভারব্রিজের ওঠা ও নামার পথে আটটি স্পটে ছিনতাইয়ে ঘটনা বেশি হচ্ছে। এ ছাড়াও হাতিরঝিলের সঙ্গে বেগুনবাড়ি, কুনিপাড়া, তেজগাঁও, বাড্ডা, উলন, মহানগর ও মধুবাগ এলাকায় অন্তত ৩৮টি গলি আছে। সেতুগুলোর বিপরীত পাশে রয়েছে কিছু অন্ধকার এলাকা। সেসব এলাকায়ও নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়।

এদিকে অন্য কোনো স্থানে লোকজনকে হত্যা করে বিভিন্ন গাড়িতে করে এখানকার পানিতে লাশ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। থানা সূত্র জানায়, গত মাসের ২০শে এপ্রিল হাতিরঝিলের লেক থেকে ফয়েজ কাদের চৌধুরী (২৮) নামে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর পাঁচদিন আগে ১৫ই এপ্রিলও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৪শে জানুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের লাশ পাওয়া যায়। তার বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। ২০২৩ সালের ২১শে জুলাই হাতিরঝিলের মধুবাগে অজ্ঞাত পরিচয় এক তরুণের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

২০২৩ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার মধুবাগ এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির (৬৫) লাশ পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ৮ই জুন গুলশান থানাধীন হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজা এলাকা থেকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার আবদুল বারির রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ২০২২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি কে বা কারা এক নবজাতকের লাশ ফেলে রেখে যায়। লাল কাপড়ে মোড়ানো একটি ব্যাগ দেখতে পায় পুলিশ। পরে সেটি উদ্ধার করেন তারা।

২০২১ সালের ১৬ই জানুয়ারি হাতিরঝিলে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের লাশ পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের ২০শে এপ্রিল হাতিরঝিলের রামপুরা ব্রিজের নিচ থেকে এক অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২২ সালের ২১শে ডিসেম্বর হাতিরঝিলের এফডিসি গেটের উল্টা দিকে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের ১৭ই মে হাতিরঝিল এলাকা থেকে জিয়াউল হক সেন্টু নামে নাটোর জেলার বড়াইগ্রামের একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এলাকাটির বাসিন্দা ও নিয়মিত চলাচলকারীরা বলছে, হাতিরঝিলে দিনের বেলায় লোকজনের সমাগম বাড়লেও রাতের বেলায় ওয়াকওয়ে দিয়ে লোক চলাচল কম থাকে। অনেক স্থানে আবার ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) সচল নেই। ফাঁকা এলাকায় পুলিশের টহল কম হওয়া, চেকপোস্টে কর্মরতদের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা, অনেক স্থানে আলোস্বল্পতা ও সড়কে কম সিগন্যাল থাকার কারণে দুর্বৃত্তরা সহজেই লেকের পানিতে লাশ ফেলে পালিয়ে যেতে পারছে।

তবে হাতিরঝিলে উদ্ধার হওয়া এসব লাশের বেশির ভাগই আত্মহত্যা সংক্রান্ত বলে জানিয়েছেন হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ শাহ (ওসি) মো. আওলাদ হোসেন। তিনি বলেন, আমি আমার এই কর্ম সময়ের মধ্যে যে লাশগুলো উদ্ধার করেছি, সেগুলোর বেশির ভাগই দেখেছি হাতিরঝিল থেকে ৮/১০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে এখানে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে ঠেকানো কঠিন। তবু পুলিশের চোখে পড়লে তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাও আছে।

সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে চলেছি। সিসি ক্যামেররা বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যামেরাগুলো অনেক উপরে লাগানো। এর ফলে জুম করলেও অনেক সময় বোঝার উপায় থাকে না। mzaim.com




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD