দেশে বর্ষার মৌসুম শুরু হলেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও খোঁড়াখুঁড়ির পর ফেলে রাখা হয়েছে ক্ষতবিক্ষত সড়ক। ঢাকার দুই সিটি বিভিন্ন এলাকায় এমন সড়কের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। ক্ষতবিক্ষত, খানাখন্দে ভরা এসব সড়ক বৃষ্টিতে হয়ে পড়ে জলাবদ্ধ ও কর্দমাক্ত। এসব সড়কে চলাচলকারী নগরবাসীকে শিকার হতে হচ্ছে অন্তহীন দুর্ভোগের।
সরেজমিন দেখা গেছে, পুরান ঢাকার ৪৮ ওয়ার্ডের কলার আড়ত, কবরস্থান রোড, সায়েদাবাদ পাম্পের গলি, বিবির বাগিচা, সুতি খালপাড় এবং ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের ধলপুর, বাদল সর্দার গলি খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে রেখেছে ঢাকা ওয়াসা। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনগর, ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের লালমিয়া সরকার রোড, মুরাদপুর মাদরাসা রোড, মুরাদপুর মেডিকেল রোড, মুরাদপুর হাই স্কুল রোডসহ ওয়ার্ডে প্রধান সড়ক, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাগানবাড়ি গলি এলাকা, ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের নামা শ্যামপুর, মাদবর বাজার, শাহী মসজিদ রোড, মাদবর বাজার রোড, সালাউদ্দিন স্কুল রোড, সবুজ বাগ, ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেরাজ নগর এ ব্লক, মেরাজ নগর ডি ব্লকের ১, ২ ও ৩ নম্বর গলি, পূর্ব কদমতলী, মোহাম্মদবাগ এলাকার সড়কগুলো এতই করুণ অবস্থা যে, ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করা দুরূহ হয়ে পড়ছে।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, পুরান ঢাকার ৬১ নম্বর ওয়ার্ডের পাটেরবাগ, নোয়াখালী পট্টি, দক্ষিণ দনিয়া, বর্ণমালা স্কুল রোড, একে স্কুল রোড, ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের শেখদি স্কুল রোড, নয়ানগর কুতুবখালী, ছনটেক, গোবিন্দপুর, বাগানবাড়ি, মেধাবাড়ি, শেখদী আব্দুল্লাহপুর মোল্লা স্কুল রোড এবং ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাতুয়াইল কবরস্থান রোড, সুলতানা মেম্বার বাড়ির রোডের অবস্থাও করুণ। মানুষের চলাচল উপযোগী নেই ওয়ার্ডের সড়কগুলোর। এছাড়া ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাতুয়াইল কবরস্থান রোড, ফার্মের মোড়, মুসলিম নগর, মোগল নগর, কেরানিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলির অবস্থাও খুবই নাজুক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় ঢাকা ওয়াসার পানির লাইন অনেক পুরোনো। ওই পানির পাইপলাইন পরিবর্তন করার কাজ করছে ওয়াসা। বেশ আগে কাজ শুরু হলেও ঢিমেতালে কাজ চলায় পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। জুরাইন এলাকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মিজানুর রহমান জানান, ঢাকা ওয়াসার নিয়োজিত ঠিকাদার ঢিমেতালে কাজ করছে। সড়ক খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে রেখেছে। এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। বর্ষা চলে আসায় ভোগান্তির মাত্রা বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে পাইপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। তবে সড়ক ঠিক হতে আরও অনেক সময় লাগবে। এতদিন কষ্ট মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটির তুরাগ, উত্তরখান ও দক্ষিণখানের সড়কগুলোও দীর্ঘদিন ধরে খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশনভুক্ত হওয়ার পর প্রকল্পের আওতায় সেখানে সড়ক সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ চলছে। ওই তিন এলাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সবই খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে রাখা হয়েছে। বর্ষায় ওইসব এলাকার চলাচল যে কতটা ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক সেটা কেবল স্থানীয়রাই জানেন।
আরও জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির উত্তর শাহজাহানপুর, লালবাগসহ মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে উন্নয়ন কাজ চলছে। একই অবস্থা ঢাকা উত্তর সিটির রায়ের বাজার, শেখেরটেক, চন্দ্রিমা উদ্যান, শেরশাহ সূরী রোড, নূরজাহান রোডসহ আশপাশের বেশ কিছু সড়ক খুঁড়ে ঢাকা ওয়াসার পানির পাইপলাইন বসিয়েছে। তবে সড়কগুলো এখনো পুরোপুরি সংস্কার হয়নি। এজন্য ওইসব সড়কে চলাচলে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বাসিন্দারা। এছাড়া নতুন করে কুড়িল প্রগতি সরণি সড়কে মেট্রোরেল-১ এর নির্মাণ কাজের জন্য সেবা সংযোগ প্রতিস্থাপন কাজ চলছে। সেজন্য কুড়িল চৌরাস্তা থেকে কালাচাঁদপুর পর্যন্ত সড়কের একাংশ বন্ধ করে কাজ চলছে। এ কারণে বসুন্ধরা গেট, যুমনা ফিউচার পার্কের সামনের এলাকা পর্যন্ত তীব্র যানজট হচ্ছে। বলা চলে ওই কাজের কারণে সড়কের কাজের গতি অনেকাংশে কমে গেছে।
নগর সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষার মৌসুমে রাজধানীর সড়ক খুঁড়ে উন্নয়ন কাজ করার কথা নয়। সড়ক নীতিমালায় এই সময়ের কাজকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এরপরও সিটি করপোরেশনের নিজস্ব, বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। নীতিমালার শর্তগুলো বাস্তবায়ন উপেক্ষিত থাকছে। অর্থছাড়ে দেরি, বিদেশি ফান্ড ফেরত যাওয়া এবং অর্থবছরের মধ্যে কাজ শেষ করার তাড়া এসব দেখিয়ে বর্ষার মৌসুমেও সড়ক খুঁড়ে দেদার উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলছে। এতেই জলাবদ্ধতা ও সড়ক কর্দমাক্ত হচ্ছে। ফলে সড়কে চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, সিটি করপোরেশন বর্ষার মৌসুমে নিজেরা বা কোনো সংস্থাকে সড়ক খোঁড়ার অনুমোদন দেয় না। আগে থেকে যেসব কাজ চলমান রয়েছে, সেগুলোর কিছু কিছু কাজ চলছে। এসব কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, কিছু কাজ থাকে প্রকল্পের। সেসব নির্ধারিত সময়ে শেষ করারও টার্গেট থাকে। সেসব ক্ষেত্রে নগর সংস্থাগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দিয়ে থাকে কর্তৃপক্ষ। তবে এর পরিমাণ খুবই নগণ্য।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি মূল শহরের মধ্যে খুবই স্বল্প পরিমাণ সড়কে কাজ চলছে। যেগুলো চলমান সেগুলোও দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ হয়ে যাবে।
তবে সম্প্রসারিত এলাকায় একটি প্রকল্পের আওতায় কাজ চলমান রয়েছে। মেয়রের বিশেষ তদারকিতে ওই এলাকার কাজের গতিও বেড়েছে।(যুগান্তর)