বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর বাড্ডা, আবতাবনগর, উত্তরা-আজমপুরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে ৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের এক শিক্ষার্থী, রামপুরায় এক পথচারী, সাভারে এক শিক্ষার্থী এবং মাদারীপুরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল ১০ জনের। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে এসব নিহতের ঘটনা ঘটে।
সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। দেশের অন্যান্য স্থান থেকেও আসছে ক্ষয়ক্ষতির খবর। আহত হয়েছেন কয়েক শ আন্দোলনকারী।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, উত্তরায় নিহত দুজনই আন্দোলনকারী। আর বাড্ডায় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নিহত ব্যক্তি পথচারী ছিলেন। তিনি পেশায় মাইক্রোবাসচালক বলে রামপুরার ফরাজী হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘সর্বাত্মক অবরোধ’ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকালে মেরুল বাড্ডা এলাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পাশের ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাতে যোগ দেন। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলতে থাকে।
এর মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুলাল মাতব্বর নামের ওই ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় ফরাজী হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করে হাসপাতালের উপমহাব্যবস্থাপক রুবেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সংঘর্ষে আহত প্রায় দুই শ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাঁদের অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
উত্তরায়ও সকাল থেকে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ চলছে। সংঘর্ষে অন্তত দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সাব্বির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সংঘর্ষে নিহত এক ছাত্রকে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাঁদের হাসপাতালে আনা হয়।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নিহত ওই ছাত্র নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁর লাশ নিয়ে গেছেন।
অধ্যক্ষ জানান, শতাধিক ছাত্র আহত অবস্থায় এই হাসপাতালে আসেন। তাঁদের অনেককেই চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বেলা তিনটা পর্যন্ত হাসপাতালে প্রায় ৩০ জন আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
অধ্যক্ষ সাব্বির আহমেদ বলেন, আহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে হাসপাতালে স্থান দিতে তাদের সমস্যা হচ্ছে।
এদিকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ৪০০ জনের বেশি আন্দোলনকারী আহত হয়ে তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ থেকে ১২ জন চোখে আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের বাংলাদেশ আই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও র্যাবের সংঘর্ষ শুরু আজ বেলা ১১টার পর থেকে।
ঘটনাস্থল থেকে প্রথম আলোর গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা উত্তরার জমজম টাওয়ারের সামনে জড়ো হন। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে মূল সড়কে উঠতে চাইলে পুলিশ ও র্যাব তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পরে সংঘর্ষ শুরু হয়।
উত্তরা-আজমপুর
উত্তরা-আজমপুর এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছেন। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট মিজানুর রহমান বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আহত হয়ে ৫০ জনেরও বেশি হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও আছেন।
আফতাবনগর
রাজধানীর আফতাবনগরে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিতে এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকাল ২ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওই শিক্ষার্থীর নাম শরীফ হাসান।
সে রাজধানীর ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র। তার বাবার নাম জিল্লুর রহমান। তাদের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়, আবতাবনগরে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। নিহতের বাবা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বাড্ডা-রামপুরা
রাজধানীর বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় পুলিশ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘাতে একজন নিহত হয়েছেন। এ সময় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতের নাম দুলাল মাতবর। তিনি পেশায় ড্রাইভার। সংঘাতের সময় তিনি একটি হাইএস গাড়ি চালিয়ে ওই এলাকা পার হচ্ছিলেন। সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আশংকাজনক অবস্থায় তাকে ফরাজি হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রুবেল হোসেন নিহতের বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি বলেন, নিহতের বুকের কাছে একটি গোল ক্ষত চিহ্নিত রয়েছে। তবে এটি বুলেটের ক্ষত কি না, তা এখনো নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, সারা দেশে আজ বৃহস্পতিবার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা। গতকাল বুধবার রাত ৮টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ।