রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১২ অপরাহ্ন




মধ্যরাতে সচিবালয়ে আগুন, নানা প্রশ্ন

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৪ ৫:১২ pm
Govt মন্ত্রণালয় অফিস secretariat bd Bangladesh Secretariat সচিবালয়
file pic

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত দপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয়। আর এই দপ্তরে মধ্যরাতে আগুন লাগার ঘটনা জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। গতকাল বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। ৬ ঘণ্টা পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

এদিকে গতকাল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবি করে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন আমলারা। প্রশাসনে এমন চলমান অস্থিরতার মধ্যেই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো।

এটি নাশকতা, না-কি স্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ড এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।

তিনি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এখনো জানা যায়নি। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।’

অন্যদিকে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে ‘সিমপ্যাথি গেইন’ ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘এই ক্যাম্পেইন না থামাতে পারলে আপনি শেষ। আজকে আমলা আগামীকাল অন্য কেউ।’

তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ফ্যাসিজমের এনাবলারদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উদারতা দেখানোর পরিণাম এই কপালপোড়া জাতিকে অনন্তকাল ভুগাবে। হাসিনার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) ঘি খাওয়া ফ্যাসিস্ট এনাবেলররাই এখন মানবাধিকারের আলাপ দিয়ে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে ‘সিমপ্যাথি গেইন’ ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। এই ক্যাম্পেইন না থামাতে পারলে আপনি শেষ। আজকে আমলা আগামীকাল অন্য কেউ। সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের পর এমন মন্তব্য এলো তার কাছ থেকে।

আগুন পরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে বলে মনে করেন সচিবালয়ের কাছে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘যে আগুনটা লেগেছে, সুনিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন এটা সুপরিকল্পিত।’

সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘সচিবালয়ের ভেতরে একশ থেকে দেড়শ সিকিউরিটি গার্ড থাকে। আগুন লাগার পর কি একজনেরও চোখে পড়েনি। এটা কীভাবে সম্ভব।’

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সকাল ৯টার দিকে সচিবালয়ে উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেখানে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভেতরে আমরা দেখবো। পুরো সার্চ করে কোনোকিছু পাওয়া যায় কি-না দেখা হবে।’

নাশকতা কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত হওয়ার পর বিষয়টি জানা যাবে।’

এদিকে সচিবালয়ের আগুনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানাবিধ আলোচনা। অনেক ব্যবহারকারী এই আগুনকে নাশকতা বলছেন, কেউ বা নিরাপত্তা নিয়েও তুলছেন প্রশ্ন।

উল্লেখ্য, বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় সচিবালয়ে আগুন নেভাতে গিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাকচাপায় মো. সোহানুর জামান নয়ন (২৮) নামে এক ফায়ার সার্ভিস সদস্য নিহত হয়েছেন। তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে কর্মরত ছিলেন তিনি।

সচিবালয়ে আগুনের কারণ খুঁজতে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন

সচিবালয়ে আগুনের ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠপ্রশাসন) মোহাম্মদ খালেদ রহীমকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এ কমিটির সদস্য-সচিব হবেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচে নয়)।

সদস্য হিসেবে থাকবেন- জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিনিধি।

সাত সদস্যের ওই কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদঘাটন, অগ্নি দুর্ঘটনার পেছনে কারো ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না তা উদ্ঘাটন, এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে সুপারিশ প্রেরণ। কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৬ ডিসেম্বর) দিবাগত মধ্যরাত ১টা ৫২ মিনিটে আগুন লাগার সংবাদ পায় ফায়ার সার্ভিস। কয়েক মিনিটের মাথায় আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় পর্যায়ক্রমে ১৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ৬ ঘণ্টার বেশি সময় পর বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে আগুন নেভানোর সময় ট্রাকচাপায় আহত হওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত ফায়ার ফাইটারের নাম মো. সোহানুজ্জামান নয়ন। তিনি তেজগাঁও ফায়ার টিমের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্য। তার বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরে।

দরিদ্র বাবা-মায়ের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন ফায়ার ফাইটার নয়ন

সচিবালয়ে আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে ট্রাকচাপায় নিহত ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামান নয়ন ছিলেন পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। কৃষক বাবা আক্তারুজ্জামানের সব ভরসা ছিল তাকে ঘিরেই। অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলের চাকরি দিয়ে অনাগত দিনগুলো সুখে শান্তিতে কাটাবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হওয়ার আগেই ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিলো সব।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ছড়ান আটকুনিয়া গ্রামের আক্তারুজ্জামান ও নার্গিস দম্পতির একমাত্র ছেলে সোহানুর জামান নয়ন। এক বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে ছোট নয়ন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জিয়াউল হক জুয়েল জানান, নয়নের পরিবার নদীভাঙনের শিকার। নিজস্ব জমিজমা বলতে তেমন কিছু নেই। অনেক কষ্টে একমাত্র ছেলেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করিয়েছেন। ২০২২ সালে তার চাকরি হয়। ছেলের চাকরিতে পরিবারে একটু সচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টিকলো না। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন পরিবারটি দিশাহারা।

ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আক্তারুজ্জামান। শুধু বলেন, ‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ অনেক ভারী। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। সবকিছু শেষ হয়ে গেলো।’ এদিকে একমাত্র ছেলের শোকে পাগলপ্রায় মা নার্গিস আক্তার।

ইউপি চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম সরকার বলেন, নয়নের পরিবার অনেক গরিব। এভাবে অকালে তার চলে যাওয়াটা কষ্টের। সরকারিভাবে ওই পরিবারের জন্য কিছু একটা করার জন্য জোর দাবি জানাই।

চোখের জলে অকুতোভয় বীরকে বিদায় দিলো ফায়ার সার্ভিস

ফায়ার ফাইটার সোয়ানুর জামান নয়ন (২৪) ছিলেন একজন নির্ভীক ও দক্ষ কর্মী। নির্ভীক ও দক্ষ কর্মীর সুবাদে তাকে সম্প্রতি সিলেট থেকে নিয়ে আসা হয় ঢাকার তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনে। কর্ম দক্ষতার কারণে দুই বছর চাকরি জীবনে স্থান করে নিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ‘স্পেশাল টিমে’।

সর্বশেষ বুধবার দিনগত রাতে দেশের প্রশাসনিক প্রাণ কেন্দ্র সচিবালয়ের আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে গিয়ে ট্রাকচাপায় নিহত হন নয়ন। তার এই অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার পরিবার থেকে শুরু করে সহকর্মীরা।

বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) নিহত ফায়ার ফাইটার নয়নের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ফায়ার সার্ভিসের সদরদপ্তর প্রাঙ্গণে।

এসময় ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তর প্রাঙ্গণে ছিল শোকের ছায়া। দেশের পতাকায় মোড়ানো ফায়ার ফাইটার নয়নের মরদেহ যখন ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে রাখা হয় তখন নেমে আসে শোকের ছায়া। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের চোখ তখন অশ্রুশিক্ত।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD