তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে। এরপরের অবস্থান রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তৃতীয় অবস্থানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
সোমবার (০৬ জুলাই) সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) প্রকাশিত এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া তরুণরা মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে বিএনপি ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পাবে, জামায়াত পাবে ২১ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোট। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ, অন্য ধর্মীয় দলগুলো পাবে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট, জাতীয় পার্টি পাবে ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং অন্যান্য দল পাবে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ ভোট।
সানেমের জরিপে আরও উঠে এসেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি পেলে আওয়ামী লীগ পাবে ১৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ভোট।
জরিপে আরও দেখা গেছে, বিএনপিকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে গ্রামীণ অঞ্চলের ৩৭ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং শহর অঞ্চলের ৩৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জামায়াতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন গ্রামের ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং শহরের ২১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এনসিপির ক্ষেত্রে এ হার গ্রামে ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং শহরে ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন গ্রামীণ অঞ্চলের ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং শহর অঞ্চলের ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ ভোটার। অর্থাৎ জরিপ অনুযায়ী, দলটির প্রতি গ্রামীণ ভোটারদের সমর্থন শহরের তুলনায় কিছুটা বেশি।
দেশের সবকটি বিভাগের ওপর চালানো এ জরিপে অংশ নেন ১৫-৩৫ বছর বয়সি ২ হাজার মানুষ। প্রথমে ৮ বিভাগ থেকে ২টি করে জেলা বাছাই করা হয়। এরপর সেখান থেকে আবার দুটি করে উপজেলা নির্বাচন করা হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে ৪০ শতাংশ, এসএসসি বা এর ওপরে ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে শহরের ছিল ৫০ শতাংশ এবং গ্রামের ৫০ শতাংশ।
পুরো প্রতিবেদন-
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমিত চাকরির সুযোগ, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, মানহীন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব তাদের অগ্রযাত্রাকে বারবার ব্যাহত করছে। এসব বাঁধা শুধু তরুণদের ব্যক্তিগত উন্নয়নকেই থামিয়ে দিচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও পিছিয়ে দিচ্ছে। এই সংকট ঘিরেই সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা দেখা গেছে। তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত জুলাই অভ্যুত্থান মূলত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মহীনতার বিরুদ্ধে জমে ওঠা দীর্ঘদিনের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে “যুব জরিপ ২০২৫” শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা এবং চাকরির বাজারে তাদের প্রস্তুতি নিয়ে তাদের নিজস্ব ধারণা বিশ্লেষণ করা। এছাড়াও, জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে তরুণরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গতিপথ, অন্তর্ভুক্তি ও কার্যকারিতা সম্পর্কে কীভাবে চিন্তা করছে—তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। জরিপটি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। সার্বিকভাবে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিলো তরুণদের দাবি ও আকাঙ্ক্ষাগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা, যেন তা নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয় এবং যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
১৫-৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে “যুব জরিপ ২০২৫” এর প্রথম ধাপ পরিচালিত হয় গত ২০ থেকে ৩১ মে, ২০২৫ পর্যন্ত। সকলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জরিপটি সারাদেশের আটটি বিভাগজুড়ে ২,০০৩টি পরিবারে পরিচালিত হয়। জরিপে নারী-পুরুষ, শহর-গ্রামের মধ্যে সমান প্রতিনিধিত্ব, এসএসসির নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন তরুণদের ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণ এবং ১০ শতাংশেরও বেশি অ-মুসলিম তরুণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। জরিপটি সম্পূর্ণভাবে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষিত গণনাকারীদের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে। তথ্যকে আরও জীবন্ত ও মানবিক করতে কিছু তরুণের ব্যক্তিগত গল্প ও সংগ্রাম তুলে ধরে কেস স্টাডিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জরিপ করা পরিবারগুলোর মধ্যে ৫৮.৫ শতাংশ প্রধানত সেবা খাতের উপর নির্ভরশীল, ২৪ শতাংশ কৃষিতে, ৬.১ শতাংশ শিল্পখাতে এবং বাকি অংশ অন্যান্য পেশায় যুক্ত। শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা যায়, ৪৪.৫ শতাংশ এখনও পড়াশোনা করছে, ১৫.৪ শতাংশ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করেছে, আর ৩৭.৬ শতাংশ নানা কারণে (বাল্যবিবাহ, পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য, শিক্ষার খরচ বহনের অক্ষমতা ইত্যাদি) পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে, ৪৭.৩ শতাংশ তরুণ পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন চাকরিতে যুক্ত, ১৩.৭ শতাংশ সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজছে কিন্তু এখনও পাননি। যারা কর্মরত, তাদের মধ্যে ৭৫.৭ শতাংশ সেবা খাতে কাজ করছে, বাকিরা কৃষি ও শিল্প খাতে।
চাকরির বাজার সম্পর্কে তরুণদের উপলব্ধি বেশ গভীর ইঙ্গিত দেয়। তরুণদেরকে শিক্ষা কতটা চাকরির জন্য প্রস্তুত করেছে—এমন প্রশ্নে মাত্র ১৪.৫৪ শতাংশ নিজেদের ভালোভাবে প্রস্তুত মনে করেছে, অন্যদিকে ৩০.৭৮ শতাংশ মনে করে তাদের শিক্ষার চাকরির প্রস্তুতিতে কোনো অবদানই নেই। ক্যারিয়ার চাহিদার ক্ষেত্রে, ৩৬.৯৯ শতাংশ সরকারি চাকরিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, আর ২৬.৪১ শতাংশ উদ্যোক্তা হতে চায়। লিঙ্গভিত্তিকভাবে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে ৪১.৭৫ শতাংশ সরকারি চাকরিকে পছন্দ করে, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩২.৮৭ শতাংশ।
চাকরি খোঁজার সময়কালও হতাশাজনক—২৮.৬৬ শতাংশ দুই বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি খুঁজছেন, আর মাত্র ১.৮৩ শতাংশ গত এক মাসে খোঁজা শুরু করেছেন। যারা গত এক বছরে অন্তত একটি চাকরির জন্য আবেদন করেছে, তাদের মধ্যে ৪৫.১২ শতাংশ কখনোই সাক্ষাৎকার কল পাননি। প্রশিক্ষণের দিক থেকে, মাত্র ১১.৬৮ শতাংশ গত এক বছরে কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যার মধ্যে ৪৮.৭ শতাংশ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। খুব কম শতাংশ তরুণের বেসিক ইমেইল লেখা, কম্পিউটারে চিঠি ড্রাফট করার যোগ্যতা কিংবা আপডেটেড সিভি নেই।
আন্তর্জাতিক অভিবাসনও জরিপে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ১.৭ শতাংশ তরুণ বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরে এসেছেন এবং তাদের মধ্যে ৭২.৭৩ শতাংশ আবার যেতে আগ্রহী। যারা কখনো বিদেশে যায়নি, তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশ যেতে চায়, আর ৫৭.৩ শতাংশ দেশে থেকেই কিছু করতে চায়। যারা দেশে থাকতে চায়, তাদের মধ্যে নারীর হার ৭০.৫৭ শতাংশ, আর পুরুষের ৪৫.৫৭ শতাংশ। বিদেশে যাওয়ার প্রধান মোটিভেশন—উচ্চ বেতন, ভালো সুযোগ-সুবিধা, আর উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশা।
গিগ ইকোনমি বা ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে ৪২.৩৪ শতাংশ তরুণ একেবারেই অবগত না, আর মাত্র ৯.৯৯ শতাংশ একে ভালোভাবে চেনে। তবে ৭০.৮ শতাংশ তরুণ মনে করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো স্বাধীনতা ও বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ, আর ৫৮.৭ শতাংশ মনে করে এটি দেশীয় চাকরির তুলনায় বেশি আয় দেয়।
চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ৫৪.৭২ শতাংশ তরুণ ঘুষ ও স্বজনপ্রীতিকে চিহ্নিত করেছে। এরপর রয়েছে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব (৫২.৬৭%), চাকরির সুযোগের স্বল্পতা (৫০.০২%) এবং শিক্ষার সাথে চাকরির বাজারের অসামঞ্জস্য (৪৯.৩৮%)। জরিপের সঙ্গে থাকা কেস স্টাডিগুলো এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে—একজন মাস্টার্সধারী স্কুল শিক্ষিকা ও সিঙ্গেল মাদার মাসে মাত্র ৫০০০ টাকার কম আয় করেন। আর ঝালকাঠির এক ৩০ বছর বয়সী তরুণ ফ্রিল্যান্সার জানিয়েছেন, তিনি চাকরির আবেদন বন্ধ করে দিয়েছেন কারণ তিনি জানেন, ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়া সম্ভব না।
জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী রাজনীতি ও সংস্কার নিয়ে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিও জরিপে তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকে দেখা যায়, মাত্র ২৩.৩৭ শতাংশ তরুণ নিয়মিত রাজনীতি অনুসরণ করে, ৩৯.০৯ শতাংশ মাঝে মাঝে করে, আর ৩৭.৫৪ শতাংশ একেবারেই আগ্রহী না। নারীদের মধ্যে ২৪.২৭ শতাংশ জাতীয় রাজনীতিতে আগ্রহী না, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এ হার ১৬.৪৮ শতাংশ। ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতি অনুসরণকারী তরুণের হারও খুব কম—পুরুষদের মধ্যে ৯.৩১ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে মাত্র ৫.১৮ শতাংশ। আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই চিত্র—পুরুষদের মধ্যে ১২.৩৮ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে ১৯.৮৫ শতাংশ একেবারে অনবগত, যেখানে মাত্র ৯.১২ শতাংশ পুরুষ ও ৪.৬৪ শতাংশ নারী এই বিষয়ে ভালোভাবে অবগত।
তথ্য পাওয়ার উৎস হিসেবে তরুণদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় (৮৭.৪ শতাংশ), এরপর আছে টেলিভিশন (৪৭.৭ শতাংশ), বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা (৩৬.৮ শতাংশ) এবং পত্রিকা (১৩ শতাংশ)। রেডিও এবং অন্যান্য মাধ্যমগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম ব্যবহৃত হয়। এই গবেষণা একটি জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে—যেখানে বাংলাদেশি তরুণদের আশা-নিরাশা, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার কথা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
রাজনৈতিক দলের কার্যকারিতা নিয়ে তরুণদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। মাত্র ১১.৮২ শতাংশ মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডা দেশের প্রকৃত সমস্যা প্রতিফলিত করে, যেখানে ৪৯.৪২ শতাংশ একেবারেই এ বিষয়ে একমত নন। অর্ধেক তরুণ (৫০.১ শতাংশ) মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সঙ্গে কোনো সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি, আর বিপরীতে মাত্র ১৬.১ শতাংশ তরুণ মনে করেন যে দলগুলো তরুণদের সঙ্গে যুক্ত।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও তরুণদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। মাত্র ৩.৩ শতাংশ মনে করেন সংস্কার ছাড়াই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে ৫৬.৪ শতাংশ বিশ্বাস করেন, যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। অপরদিকে, ১১.৩ শতাংশ তরুণ ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আরও অবনতি দেখছেন এবং ১৩.১ শতাংশ মনে করেন, কিছুই পরিবর্তন হবে না।
এই পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যায় রাজনীতিতে ভবিষ্যতে অংশগ্রহণ নিয়ে তরুণদের মনোভাবেও। ৮২.৭ শতাংশ তরুণ কোনোভাবেই রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নন। ১১.৫ শতাংশ তরুণের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ আছে এবং মাত্র ১.৬ শতাংশ বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন।
রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিয়ে তরুণদের প্রত্যাশা অনেকটাই আদর্শভিত্তিক। ৬০ শতাংশ তরুণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন যে তারা পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতা দূর করবে। ৫৪ শতাংশ চায় নিয়মিত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হোক। পাশাপাশি, ৪৮.২৩ শতাংশ তরুণ মনে করেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত নয়। যারা এর বিপক্ষে, তাদের মধ্যে ৮৭.৭৭ শতাংশ অ-মুসলিম, আর যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে সমর্থন করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ১২.২৩ শতাংশ অ-মুসলিম।
সকল ধর্মীয় পটভূমির তরুণদের মধ্যেই ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ৩৮.৩ শতাংশ তরুণ এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, এবং ৮.৯ শতাংশ খুবই চিন্তিত। ২২.৮ শতাংশ মনে করেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না, তবে ১১.৬ শতাংশ বিশ্বাস করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই তা হতে পারে
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা গেছে। প্রায় ২১.১৭ শতাংশ তরুণ পর্যবেক্ষণ করেছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্রমেই বেশি অনিরাপদ অনুভব করছে। এই গোষ্ঠীর মধ্যে ৫৩.২৪ শতাংশ অ-মুসলিম, যারা নিজেরাও ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন।
জরিপের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তরুণদের মতামত মিশ্র ছিল। ৫৩ শতাংশ মনে করেন, সরকার সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সফল হয়েছে, যেখানে ১৫.৬ শতাংশ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ৩৯.১ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে ১৯.২ শতাংশ কোনো অগ্রগতি দেখেননি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও মতভেদ দেখা যায়—৩৩.৬ শতাংশ উন্নতি দেখেছেন, কিন্তু ২৮.২ শতাংশ মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বজায় রাখা হয়নি। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ৫৬ শতাংশ মনে করেন, এখন মানুষ বেশি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছে, তবে ১৯.৩ শতাংশ একমত নন। এই তথ্যগুলো তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে—যেখানে তারা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রতি একদিকে হতাশ, অন্যদিকে পরিবর্তনের জন্য সত্যিকারের সংস্কার প্রত্যাশী।
তবে, দেশের তরুণদের মধ্যে ৯৩.৯৬ শতাংশই আশাবাদী যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। তবে ৬.০৪ শতাংশ ইতোমধ্যেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৭৬.৭৮ শতাংশ তরুণ, অন্যদিকে ৪.১৪ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে অনাগ্রহী।
বর্তমান প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি অনুমানভিত্তিক প্রশ্ন করা হয়—আগামী নির্বাচনে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেতে পারে? তরুণদের অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে, আনুমানিক ৩৮.৭৬ শতাংশ। এরপর আছে জামায়াতে ইসলামী (২১.৪৫ শতাংশ)। অন্যান্য ইসলামপন্থী দল, এনসিপি ও জাতীয় পার্টির অবস্থান আরও নিচে। এছাড়াও, যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারতো, তবে তা অন্তত ১৫ শতাংশ ভোট পেত বলে মনে করেছেন অনেকেই।
ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির প্রতি পুরুষ ভোটারদের সমর্থন নারীদের তুলনায় একটু বেশি (পুরুষ ৪০.০৩%, নারী কম)। জামায়াতের ক্ষেত্রেও পুরুষ সমর্থন বেশি (২২.৫১%) নারীর তুলনায় (২০.৫৭%)। অন্যদিকে, এনসিপির প্রতি নারীদের সমর্থন পুরুষদের চেয়ে বেশি, এবং শহরাঞ্চলে এই দলের জনপ্রিয়তা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি।
সংস্কার কোন খাত থেকে শুরু হওয়া উচিত—এই প্রশ্নে ৯৪ শতাংশ তরুণ একমত যে শিক্ষা খাত থেকেই পরিবর্তন শুরু করা দরকার। এরপর তরুণদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে স্বাস্থ্য খাত (৯২%), শ্রমবাজার (৯০%), মানবাধিকার (৮৯%), প্রাতিষ্ঠানিক শাসন (৮৫%), এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা (৬৭%)। তবে ৩.৯৯ শতাংশ মনে করেন তাদের অগ্রাধিকারগুলো জরিপে একেবারেই প্রতিফলিত হয়নি, আর ১২.১৩ শতাংশের মতে এগুলো খুব সামান্যই উঠে এসেছে।
জরিপে দেখা যায়, প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পর্কে প্রায় অর্ধেক (৪৩.৫ শতাংশ) তরুণ একেবারেই অবগত নয়। মাত্র ২.৩ শতাংশ দাবি করেছেন যে তারা এই সংস্কার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে জানেন। যারা কিছুটা জানেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক, শ্রম সংক্রান্ত এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সংস্কার সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সংস্কারগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা ও চাহিদাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে—এই প্রশ্নে ৩.৯৫ শতাংশ মনে করেন, এসব বিষয় পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে। বাকি অংশ মনে করেন, কিছুটা হলেও এসব বিষয় স্বীকৃতি পাচ্ছে। তবুও, ১৩.৫ শতাংশ তরুণের আশঙ্কা, এই সংস্কারগুলো হয়তো কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।
এই ফলাফলগুলো তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রত্যাশা এবং সংশয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে—যেখানে তারা একদিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি আশাবাদী, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সন্দেহ ও হতাশার সঙ্গেও বসবাস করছে।