রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৩ অপরাহ্ন




ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, নাম ও ছবি প্রকাশ করতে চায় ব্যাংকগুলো

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬ ৭:২৪ pm
Association of Bankers, Bangladesh ABB abb অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ এবিবি এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ এবিবি
file pic

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ সংস্কারের দাবি তুলেছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে, ঋণখেলাপিরা যেন আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যেতে না পারেন। পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমতি চেয়েছে। এ ছাড়া ঋণখেলাপিরা যাতে কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, এ দাবিও তুলেছে সংগঠনটি।

গত বছরের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে এবিবি। এই প্রস্তাবনাগুলোর মূল লক্ষ্য খেলাপি ঋণ কমানো এবং নগদ আদায় বৃদ্ধি করা। খেলাপি ঋণ কমাতে এবিবি নানা দাবি তুলেছে। এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই দাবি তোলা হয়েছে। এই চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে প্রস্তাব
খেলাপি ঋণ কমাতে তিন দফা প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো—

১. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে খেলাপি ঋণগুলো আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান।

২. লিয়েন করা শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

৩. মৃত্যু, মরণব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহ ঋণ, ক্রেডিট কার্ড কিংবা তার একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে হেড অব আইসিসির মতামত গ্রহণের শর্ত লাঘব করা।

নগদ অর্থ আদায়ে প্রস্তাব
নগদ অর্থ আদায়ে তিন প্রস্তাব আছে। এগুলো হলো—

১. খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক অথবা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া।

২. ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন প্রদান।

৩. খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপযোগী ঘোষণা প্রদান।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রিতে প্রস্তাব
বন্ধকী সম্পদ বিক্রিতে প্রস্তাবগুলো—

১. ব্যাংকের নিলামে বিক্রয় বা কেনা সম্পত্তি হস্তান্তরের সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা।

২. নিলামে সম্পদ কেনা উৎসাহিত করতে নিলাম ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত কিংবা অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান।

৩. স্থানভেদে নিলামে বিক্রিত সম্পদ কেনায় জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করা।

৪. নিলামে বিক্রিত সম্পদের হস্তান্তরে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

৫. নিলামে বিক্রয়ের সুবিধার্থে, বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতে ব্যাংককর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করার সব সুবিধা নিশ্চিত করা।

৬. আদালতকর্তৃক ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তর করা জমির (অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩(৭) ধারা মোতাবেক) নামজারি, বায়নানামার ভিত্তিতে বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা।

মামলার রায় কার্যকরে প্রস্তাব
মামলার রায় কার্যকরে প্রস্তাবগুলো হচ্ছে—

১. খেলাপি ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত, সঞ্চয়পত্রের তথ্য, মালিকানাধীন সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্নের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ, জন্মসনদ, মৃত্যুসনদ, পাসপোর্টের তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তির সুবিধা নিশ্চিত করা।

২. ব্যাংকের বা আদালতের যেকোনো পদক্ষেপের বিপরীতে আদালতে গমনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা প্রদানের শর্ত আরোপ করা।

৩. সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্টে-অর্ডার প্রাপ্তির সুবিধা আইনগতভাবে রহিত করা।

৪. উচ্চ আদালত থেকে প্রদত্ত স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ প্রদানের শর্ত নিশ্চিত করা এবং উক্ত নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতিত উক্ত স্টে-অর্ডার বাতিল হিসেবে বিবেচনা করা।

৫. উচ্চ আদালতকর্তৃক স্টে-অর্ডার প্রদানের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করা।

৬. যেসব জেলায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি, সেসব জেলায় অবিলম্বে পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন।

৭. থানায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের আটকাদেশগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা।

৮. আদালত থেকে থানায় সাত দিনের মধ্যে আটকাদেশ প্রেরণ নিশ্চিত করা।

৯. অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করা।

১০. অর্থঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশের পরিমাণ ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণভেদে সাত বছরে উন্নীত করা।

১১. স্বল্পতম সময়ে অর্থঋণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন প্রণয়ন।

খেলাপি ঋণ না বাড়াতে যত প্রস্তাব
খেলাপি ঋণ না বাড়াতে প্রস্তাবনাগুলো হচ্ছে—

১. জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ।

২. নিবন্ধক কিংবা তহবিল অফিসে বন্ধকি সম্পদের তালিকা সহজে যাচাই করার সুবিধা নিশ্চিত করা।

৩. সিআইবি ডেটাবেজের ন্যায় ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন এবং সহজে তা যাচাইকরণের সুবিধা প্রদান।

ব্যাংক খাত সূত্রে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশিই এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি। ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না, ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। কিছুদিন পর বরং খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়বে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD