বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা দেশকে ভালোবাসেন প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’-তে দেবেন। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল্যায়ন না হলে বাকি ভোটের মূল্যায়ন হবে না। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামী। এ বাংলাদেশে রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে -এ সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই। আপন যোগ্যতায় সে তার জায়গায় নির্বাচিত হবে। একজন সাধারণ রিকশাচালকের সন্তান মেধা বিকাশের মাধ্যমে তার যোগ্যতায় একদিন যেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন তেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, একটি মহল প্রচার করছে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে ইসলামী শিক্ষা ধরে রেখেছে তারাই। কওমি মাদরাসা আমাদের কলিজা। আমরা কথা নয়, কাজে প্রমাণ করব। যারা ভয় দেখায় তারা মতলববাজ। ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। এবার আর পেছনে নয়, সামনে এগোবো, ইনশাআল্লাহ। আপনারা এই ম্যারাথনে সঙ্গী হবেন। জামায়াতের ইসলামীর বিজয় চাই না, এবার ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।
যুবকদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেওয়া হবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুবসমাজ আমার বন্ধু। বেকার ভাতা তুলে দিয়ে তোমাদের অপমান করতে চাই না। তোমাদের প্রত্যেকটি হাত দেশ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তোমাদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দিতে চাই। সেদিন প্রত্যেক যুবক-যুবতী নিজের দিকে ইশারা করে বলবে, আমিই বাংলাদেশ, দেশ আমার, এই দেশকে আমি উজাড় করে দিয়েই যাব।
তিনি বলেন, অনেকে বলেন জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে মা-বোনদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না। আমাদের মা-বোন আছে না? তারা সব করছে না? তারা যদি উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারে, যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে তাহলে দেশের প্রত্যেক মা-বোনদেরও আমরা সেভাবে গড়ে তুলব। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। যারা এ কথাগুলো ছড়ায় তারা বুঝে গিয়েছে মায়েরা কোন দিকে তাকিয়ে আছে। মায়েদের দৃষ্টি এখন মুক্ত নতুন ও পরিবর্তনের বাংলাদেশের দিকে। মায়েদের দোয়া ও আস্থা আমাদের শক্তি।
জামায়াত আমির বলেন, অতীতের বস্তা পঁচা রাজনীতিতে যারা ফ্যাসিবাদ, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে, ডুবিয়ে দিয়েছে ওই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমান। এ আসমানের নিচে জমিনের উপরে বাংলাদেশে যারা বসবাস করবে আমরা তাদের সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। কেউ আমাদের বাধা দিয়ে আটকাতে পারবে না।
আবরার ফাহাদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ এই ফেনী নদী নিয়ে দুটো কথা বলায় তাকে জীবন দিতে হয়েছে। আবরার ফাহাদের রুহ্ ফেনীবাসীর কাছে রেখে গেলাম। যতদিন ফেনী দুনিয়ার বুকে থাকবে ততদিন তাকে আপনাদের বুকে জায়গা দিয়ে রাখবেন। সে আপনাদের কথা, দেশের ন্যায্যতার কথা বলায় আধিপত্যবাদের দোস-দালালরা তাকে সহ্য করতে পারেনি।
ফেনীর লালপুলে ওভারপাস ও মেডিকেল কলেজের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে জামায়াতের এ শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছি দেশের কোনো জেলা মেডিকেল কলেজ থেকে বাদ যাবে না। সবগুলো হবে সরকারি মেডিকেল কলেজ। ৩৩টি জেলায় বর্তমানে মেডিকেল কলেজ আছে, বাকি ৩১টি জেলায়ও হবে। আল্লাহ যদি সুযোগ দেন ফেনী তার পাওনা পেয়ে গর্বিত হবে, বঞ্চিত হবে না। ফেনীতে মানসম্মত একটি স্টেডিয়াম নেই। এই স্টেডিয়ামকে আধুনিক করে বিশ্বমানের করা হবে। এখানকার বিপুল মানুষ প্রবাসে থাকেন। এ দেশের অর্থনীতেতে এখানকার মানুষের বিশেষ অবদান রয়েছে। সব সমস্যাগুলো ন্যায্যতার ভিত্তিতেই সমাধান করা হবে।
ফেনীর তিনটি আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে জামায়াতের আমির আরও বলেন, তারা কোনো দলের নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের উপহার দেওয়া হয়েছে। এখানে ১১টি দল আমরা একাকার। যাদের যে প্রতীক দেওয়া হয়েছে সেটিই ১১ দলের। ১১ দলের কর্মীদের চাওয়া-পাওয়া বা মান-অভিমান থাকলে আজ আমি দুহাত তুলে তা নিয়ে যেতে চাই। মিলেমিশে লড়াই করে আধিপত্যবাদ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য ও মা-বোনদের গায়ে হাত তোলার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভোটগুলো তুলে আনতে হবে। যুব সমাজের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে হবে। এ বাংলাদেশ গড়তে যারা অঙ্গীকারবদ্ধ তাদের হাতেই আমরা ৩০০ আসনে প্রতীক তুলে দিয়েছি। এ প্রতীক স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
এর আগে, সকাল ৮টা থেকে জনসমাবেশ শুরু হয়। জনসভায় জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ সদর আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন।
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ, ফেনী জেলা জামায়াতের সাবেক আমির এ কে এম সামছুদ্দিন, শহর জামায়াতের আমির ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্র শিবিরের ফেনী শহর সভাপতি ওমর ফারুক ও জেলা সভাপতি আবু হানিফ হেলাল প্রমুখ। এ সময় জামায়াত-শিবির ও ১১ দলীয় জোটের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ জামায়াতের প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মরণ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।