চড়া মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের সুদহার কমানো-অর্থনীতির এই দুই মৌলিক সূচকের বেড়াজালে সাময়িকভাবে আটকে গেছে মুদ্রানীতি। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ঋণের সুদ চড়া রাখতে হবে। আবার সুদের হার কমালে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাবে। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতির অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে চাপ রয়েছে সব পক্ষ থেকেই। এদিকে ঋণের সুদ বেশি থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দেশে ও বৈশ্বিক বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা ঋণের সুদ হার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে আইএমএফ বলছে, মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের মধ্যে না আসা পর্যন্ত ঋণের সুদ হার কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না। এমন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সূত্র জানায়, মুদ্রানীতি নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকে বেশির ভাগ বক্তাই এবার নীতি সুদের হার (কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়) কমাতে সুপারিশ করেছিলেন। বর্তমানে নীতি সুদ হার হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা ট্রেজারি বিল পুনরায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিনে নেওয়ার সুদ হার বা রেপো রেট। বর্তমানে এর সুদ হার ১০ শতাংশ। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রেপো রেট ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২২ সালের বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব মোকাবিলা করতে মূল্যস্ফীতির হার কমাতে রেপো রেট বাড়াতে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর সর্বশেষ এ হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। গত এক বছর চার মাস ধরে ওই হার বহাল রয়েছে। যা প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রেপো রেট অনেক বেশি। চলতি বছরসহ টানা চার বছর ধরে চলছে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি। এতে ঋণের সুদের হার বেড়েছে। বাজারে টাকার প্রবাহ কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়েছে। তারপরও মূল্যস্ফীতির হার কমেনি। ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ অতিক্রম করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিম্নমুখী করতে সক্ষম হয়। গত অক্টোবর পর্যন্ত এ হার নেমে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আবার বেড়েছে। ডিসেম্বরে তা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২২ জানুয়ারি মুদ্রানীতি কমিটি বৈঠক করে নীতি সুদ হার অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করে। এর আলোকে মুদ্রানীতির কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছিল। গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় মুদ্রানীতির অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন। গত চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণের পরও মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশ মুদ্রানীতি ব্যবহারের মাধ্যমে বা নীতি সুদের হার বাড়িয়ে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ চার বছরেও পারেনি। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমাতে ব্যবসায়ীদের চাপও উপেক্ষা করতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ প্রায় সব খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে ঋণের চড়া সুদ, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রয়োগ ও ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার কারণে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা হ্রাস। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ হওয়ার নেপথ্যের প্রধান কারণগুলো ব্যাংক খাতের মাধ্যমে সৃষ্ট। ব্যাংক খাত দেখভাল করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ফলে এর দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এড়াতে পারে না বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে তারা জানুয়ারির মূল্যস্ফীতির হার কোন পর্যায়ে দাঁড়ায় সেটি দেখতে চাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলে নীতি সুদ হার কিছুটা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। আর মূল্যস্ফীতি না কমলে নীতি সুদের হার না কমানোর পক্ষেই তারা অবস্থান নেবে। সব মিলে এখন মূল্যস্ফীতি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে বলেছিল, মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে নামলে নীতি সুদ হার কিছুটা কমানো হবে। এখন আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলছে ৭ শতাংশের মধ্যে নামলেই নীতি সুদ হার কমানো হবে। এদিকে বাংলাদেশ এখনো আইএমএফের ঋণচুক্তির মধ্যে রয়েছে। ফলে তাদের শর্ত মানতে হয়। আইএমএফ বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের মধ্যে না এলে নীতি সুদ হার কমানো ঠিক হবে না।
মুদ্রানীতি ঘোষণার কিছু দিনের মধ্যে নতুন সরকার এসে দায়িত্ব নেবে। সেই সরকার স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙা করার চেষ্টা করবে। সে ক্ষেত্রে সুদের হার কমিয়ে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির হারে আবার চাপ পড়তে পারে।
(যুগান্তর)