বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন




জ্বালানি সংকট, রাতভর লাইনে থেকেও তেল মিলছে না

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৪৪ am
CNG stations CNG station Filing stations Filing station Petrol Octane Pump Price পেট্রোল অকটেন পাম্প Fuel energy জ্বালানি তেল Fuel Oil
file pic

দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানি সংকটে ছুটির দিনেও স্বস্তি মেলেনি। শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে জ্বালানি তেলের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। কোথাও পাম্প বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত বিক্রিতে দীর্ঘ লাইন। সব মিলিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল মিলছে না। তেলের জন্য রাতভর পাম্পেই অবস্থান করছেন অনেকে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশজুড়ে এখন অধিকাংশ পাম্পে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে তেল বিক্রি হচ্ছে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দেওয়া হচ্ছে না। তবুও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন করে লাইন তৈরি হচ্ছে। এক ধরনের চক্রে আটকে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা।

রাজধানীর মহাখালী, খিলক্ষেত, বাংলামটর, রমনা, আসাদগেটসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেই পেট্রোল পাম্পের সামনে সকাল থেকেই ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বেশ কয়েকজন চালক জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। কেউ কেউ রাত কাটিয়েছেন গাড়িতে বসেই, কেউ রাস্তার পাশে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তেলের নিশ্চয়তা পাননি অনেকেই। অনেক পাম্পের সামনে অপেক্ষার প্রহর ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তবুও তেল মেলেনি।

শুক্রবার বিকেল ৪টায় মৎস্য ভবন এলাকার রমনা পাম্পে তেল নিতে অপেক্ষমাণ নাজমুল সাদাত মোটরসাইকেল নিয়ে শিল্পকলার গেটের বিপরীতে লাইনে ছিলেন। নাজমুল বলেন, সকাল ৬টায় এসে এই সিরিয়াল পেয়েছেন। ১০ ঘণ্টা হয়ে গেছে লাইন আগায়নি। তাঁর সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন এই পাম্পের লাইন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে আবার পাম্পে গিয়ে শেষ হয়েছে।

সন্ধ্যায় তেজগাঁও এলাকার সিটি ফিলিং স্টেশনেও একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলেন কারচালক মকবুল হোসেন। তিনি ১১ ঘণ্টা ধরে লাইনে রয়েছেন বলে জানান।

পাম্পকর্মীরা বলছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিলম্বই এই সংকটের মূল কারণ। অনেক পাম্পে সকালে তেল না থাকায় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরে যখন তেল আসে, তখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভিড় করে। ফলে রেশনিং করে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে লাইন কমছে না, অন্যদিকে অসন্তোষ বাড়ছে।
এ সংকটকে ঘিরে ভিআইপি সুবিধা নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। সাধারণ চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তারা তেল পাচ্ছেন না। অথচ প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ লাইনের বাইরে গিয়ে মুহূর্তেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পাম্পে উত্তেজনা ও হট্টগোলের ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। মৎস্য ভবন এলাকার রমনা পাম্পে মোটরসাইকেলের চালকদের বিশৃঙ্খলার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও জটিল। নগরে ৪৬টি পেট্রোল পাম্প থাকলেও অধিকাংশ পাম্পে অকটেন ও পেট্রোল মিলছে না। কাতালগঞ্জের খান ব্রাদার্স, নতুনপাড়ার বিআরটিসি পাম্প, বালুছড়ার শিউলি পেট্রোল পাম্প, অক্সিজেন এলাকার ওয়াজেদ আলী সন্সসহ বেশ কয়েকটি পাম্প শুক্রবার সকাল থেকেই বন্ধ ছিল।

খুলশী এলাকার একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক আব্দুল হক জানান, ডিপো থেকে অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহ কম। শুধু সীমিত পরিমাণ ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। গণি বেকারি এলাকার একটি পাম্পে দুপুর থেকে বিক্রি শুরু হলেও বিকেলের মধ্যেই শত শত মোটরসাইকেলের লাইন দেখা যায়।

সিলেটের চিত্র আরও হতাশাজনক। নগরের আম্বরখানা, পাঠানটুলা, চৌকিদেখিসহ বিভিন্ন এলাকায় পাম্পগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। অনেক চালক ১৫ থেকে ২০টি পাম্প ঘুরেও জ্বালানি পাননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি পাম্পে দৈনিক মাত্র ২০০০ লিটার তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। এতে পরিবহন খাতে কার্যত স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে বহু গুণ।

উত্তরের জেলা বগুড়ায় জ্বালানি সংকট সরাসরি আঘাত হেনেছে কৃষিতে। চলতি বোরো মৌসুমে যখন সেচের জন্য ডিজেলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই তা পাওয়া যাচ্ছে না। জেলায় প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩০০ টন ডিজেলের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২২০ থেকে ২৪০ টন। ফলে প্রতিদিনই ৫০ থেকে ৬০ টনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেক কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না, উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে।

নাটোরে এই সংকট ঘিরে উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বড়াইগ্রামে একটি পাম্পে ডিজেল দিতে দেরি হওয়ায় ট্রাকচালকের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একই রাতে অন্য একটি পাম্পে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে তেল সরবরাহের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত
জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনকালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের জন্য পূর্ণ মজুত আছে এবং জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চ ও এপ্রিল মাসে নির্ধারিত ক্রুড অয়েল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদনে। এক পর্যায়ে পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে যায় এবং বাকি ইউনিটগুলোতে ‘ডেড স্টক’ দিয়ে শোধন কার্যক্রম চালাতে হয়েছে। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে নতুন কার্গো আসার পর পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, সরবরাহে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য সরকার আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়িয়েছে। এই কৌশল কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য পরিবেশনের আহ্বান জানান, যাতে জনমনে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়।

বিশেষ সুবিধা চেয়েছে পুলিশ
এদিকে সংকটের মধ্যেই বিশেষ সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলছে, জ্বালানি নিতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এতে জরুরি দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটছে। আসামি ধরতে অভিযান, টহল কিংবা দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো সব ক্ষেত্রেই সময় নষ্ট হচ্ছে। তাই দেশের সব পাম্পে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা লাইন বা বিশেষ বুথ চালুর দাবি জানিয়েছে তারা। সমকাল

(তথ্য পাঠিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD