বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ন




পদায়ন-পদোন্নতি নিয়ে নানা অভিযোগ

ক্রমেই অস্থিরতা বাড়ছে পুলিশ প্রশাসনে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১২ am
police রোড accident rash road যানজট রাস্তা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি police vigilant পুলিশ অভিযান
file pic

বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে পুলিশ প্রশাসনে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট ও তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে স্বস্তি ফিরে আসার কথা থাকলেও এ কারণে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর ভিন্ন পরিস্থিতি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো চলছে বদলি বাণিজ্য। এজন্য একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে। ফলে এ রকম অলিখিত পদায়ন বাণিজ্য নিয়ে পেশাদার পুলিশ সদস্যরা খুবই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ওপর। এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া ‘মব কালচার’ দমনে পুলিশ কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থায় বড় ধরনের আন্দোলন বা শোডাউন হলে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরম বেগ পেতে হবে। বিশেষ করে ওই রকম পরিস্থিতিতে পুলিশের কোনো অংশ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে অবহেলা করে কিংবা তৃতীয় পক্ষের সরকারবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে গোপনে সক্রিয় হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সংকট নিরসনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, এজন্য বদলি বাণিজ্য জিরো টলারেন্সে আনাসহ পুলিশ প্রশাসনে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনায় নেওয়া খুবই জরুরি। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই কঠিন কাজটি কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হবে।

আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সবার আগে বদলি বাণিজ্য বন্ধ করতেই হবে। কেউ টাকা দিয়ে পোস্টিং নিতে পারলে তাকে দিয়ে আর যাই কিছু হোক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণও সম্ভব না। কোনো ওসিকে যদি ৫০ লাখ টাকা ঘুস দিয়ে পোস্টিং নিতে হয়, তাহলে তিনি তো আগে এসে ওই টাকা তুলবেন। ফলে থানার আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা, তার কাছে প্রধান বিষয় হবে না।

পুলিশ বাহিনীতে চলমান অস্থিরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন অতিরিক্ত আইজিপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদোন্নতি-পদায়নে ফিট লিস্ট (উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা) অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি এবং থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদের মতো সংবেদনশীল স্থানগুলোতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদায়ন হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ এখন অনেকটা প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ (বিশেষ করে ইউনিট প্রধান) পদগুলো অর্থ ও তদবিরের বিনিময়ে বণ্টন করা হচ্ছে বলেও গুঞ্জন জোরালো হয়েছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশের একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশ সুপারদের (এসপি) জন্য ৬৪টি জেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে প্রায় ১০০টি। অথচ এসপির সংখ্যা ৭০০-এর বেশি। নিয়মানুযায়ী ব্যাচভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ফিট লিস্ট তৈরি করে পদায়ন করার কথা থাকলেও, সেটি করা হচ্ছে না। ফলে শুধু নানামুখী তদবিরের জোরে নিচের দিকে থাকা অযোগ্য বা তোষামোদকারী অফিসাররাও গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পেয়ে যাচ্ছে। আবার এ ধরনের বিতর্কিত কোনো পোস্টিং নিয়ে যখন কিছু প্রমাণসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি হয় তখন দ্রুত তাকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে এসব ঘটনা পুরো বাহিনীতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের মনে যে ক্ষোভ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও অনেকের মধ্যে একই ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক ঘরানার ট্যাগ লাগিয়ে ইতঃপূর্বে যাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, এখন আবার তাদের প্রাপ্য পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে নানা বাধা ও বাণিজ্য শুরু হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে কয়েকজন ভালো অফিসারকেও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দিয়ে জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠনোর মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এমন কয়েকজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, পেশাগত জীবনে তাদের সাফল্য ও সততা সর্বজনবিদিত ছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের অভিযোগ ছাড়া এভাবে একের পর এক জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর কারণে পুলিশের বিভিন্ন স্তরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্পৃহা ও পেশাদারত্ব মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালার (পিআরবি) ইচ্ছামতো সংশোধন। নতুন চার হাজার এএসআই পদ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ বিভাগীয় প্রমোশন ও ৫০ ভাগ সরাসরি নিয়োগের নিয়ম মানা হলেও, সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ পদদলিত করা হয়েছে। পিআরবি সংশোধন করে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে যোগ্যতার ভিত্তিতে এএসআই থেকে এসআই হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, যা মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, অর্থের বিনিময়ে পদ দখল করায় কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ করা টাকা তোলা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের কাছে এখন গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অধস্তনদের আস্থা কমে গেছে। তারা ভাবছেন, অতীতে সংকটের সময় যেমন শীর্ষ কর্মকর্তারা পালিয়ে গিয়ে নিজেদের বাঁচিয়েছেন, তেমনি বর্তমান নেতৃত্বও সংকটকালে একই কাজ করবে। এই আশঙ্কায় অধস্তনরা নিজের দায় নিয়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষোভ, অনিয়ম, ঘুসবাণিজ্য এবং পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনো সম্ভব হবে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সা ও অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনশেষে কিন্তু সরকারকেই খেসারত দিতে হবে।

এদিকে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, বদলি এবং পদায়ন নিয়ে গত কয়েক মাসের গুঞ্জন ও কানাঘুষা নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) প্রটোকল বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জনৈক বডিগার্ডের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই অডিও ফাঁসের পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে চলতে থাকা গোপন ‘বদলি বাণিজ্য’ ও সিন্ডিকেটের রমরমা চিত্র আবারও জনসমক্ষে চলে এসেছে, যা নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ওই অডিও রেকর্ডটিতে মূলত পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে বদলি এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের এক নগ্ন চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। রেকর্ডের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে কীভাবে ক্ষমতার প্রভাবে বা শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বদলিকে লাভজনক পেশায় পরিণত করেছে। অডিওতে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এসেছে যে, পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের সদস্যদের পছন্দমতো লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি করাতে গেলে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা লেনদেন করতে হয়।

এই লেনদেন প্রক্রিয়ায় কার কত অংশ এবং কোন কোন মাধ্যমের হাতবদল হয়ে ফাইল ছাড় হয়, তার ইঙ্গিত রয়েছে ফোনালাপে। পুলিশ প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ক্লোজড সার্কেল বা সিন্ডিকেট তৈরি করে মাঠপর্যায়ের বদলি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তার বিবরণও ফোনালাপে পাওয়া যায়।

এর আগে গত মে মাসের শেষ দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাশেমের বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। তার বক্তব্য ছিল-‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস। আমরা কেউ কাউকে ঠকাব না। সবাই মিলেমিশে থাকব। ধরেন ২ হাজার টাকা আমি খরচ করলাম, এই টাকা তো আমার বাড়ির টাকা না, বেতনের টাকাও না। আপনারা একটা অভিযোগ দিলেন ১ হাজার টাকা, আরেকটা খারিজ করে দিলেন ১ হাজার টাকা। ওইটা দিয়েই কিন্তু আমি পার করে দিলাম। তাইলে আমার তো রিস্ক নাই, নো টেনশন, খুব রিলাক্সে আছি।’ ওই রেকর্ডে ওসিকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘পুলিশের চাকরিটা এক ধরনের ব্যবসা। সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না, তবে আমরা একজন আরেকজনকে সুরক্ষায় রাখছি। সবাই সমন্বয় করে চলতে হবে। ওসির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে পারবেন না। আমি আপনাদের ঠকাব না। আমার কনস্টেবলরা যেন তাদের প্রাপ্য পায়, তারা যেন বঞ্চিত না হয়। হক মারা আমি পছন্দ করি না।’ এছাড়া অডিওতে মামলাসংক্রান্ত অর্থ লেনদেন, থানার অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তার কোনো সত্যতা নেই। বর্তমান আইজিপির বিরুদ্ধে পুলিশের ভেতরে একটি গ্রুপ সক্রিয় আছে। তারা নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আইজিপির বডিগার্ডের অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন ইন্সপেক্টর আইজিপির বডিগার্ডকে ফোন করেছিলেন। ওই বডিগার্ড ইতঃপূর্বে আমার বডিগার্ড হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই ইন্সপেক্টর আইজিপির মাধ্যমে নিজের কোনো তদবির করানোর জন্য বডিগার্ডকে বারবার অনুরোধ করছিলেন। কারণ তারা পূর্বপরিচিত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বডিগার্ড যখন তাকে স্পষ্ট জানান যে, এমন কোনো তদবির করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তখন বিশেষ উদ্দেশ্যে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। তিনি বলেন, বডিগার্ডের কথায় বদলির সুযোগ নেই।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD