এম আবদুল্লাহ: সেদিন বাংলাদেশে ভোর হয়েছিল গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। সকালের আকাশটা যেন মুখ গোমরা করে ছিল। আগের দিনের সারি সারি লাশ আর রক্তবন্যা দেখে প্রকৃতিও যেন শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। রাজধানীর রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। গা ছমছম পরিবেশ। প্রচণ্ড সুনামির আগ মুহূর্তে যেমনটা থাকে। বেলা ১০টা পর্যন্ত কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। সাড়ে ১০টার পর প্রথম পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকা থেকে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলির খবর আসে। শহীদ মিনারের দিকে যেতে চাইলে সরাসরি গুলি করে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। এর কিছু সময় পর যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, শহীদ মিনার, শাহবাগ, বাড্ডা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামার খবর আসতে শুরু করে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পেটোয়া বাহিনী কোথাও কোথাও ছাত্র-জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। বুলেট খরচ হয়, টিয়ারগ্যাস ফুরিয়ে যায়, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য জনজোয়ার আর থামে না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে হাসিনার খুনে বাহিনীর রণসাজ। সঙ্গে কাচের ঘরের মতো ধসে পড়ে দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসনের মসনদ।
দুবছর আগে ২০২৪ সালের আগস্টের পঞ্চম দিনের চিত্র ছিল এমনই। বিপ্লবীরা যার নাম রেখেছে ‘৩৬ জুলাই’। অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব মহাজাগরণে বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট স্বৈরশাসক হাসিনা সরকারের পতনের দিন। উদ্বেলিত ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় বিজয় উদযাপনের দিন। লাখো মানুষের উন্মাতাল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ার দিন। প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী আজ।
সে এক অভাবনীয় শ্রাবণ বিদ্রোহ। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল মাইলফলক। শ্রাবণ মাসে ‘বাংলা বসন্ত’ও বলা যেতে পারে। সেই বসন্ত দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রমনা আপামর জনতার মহামুক্তির, নতুন বাংলাদেশের। মৃত্যুকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করে মাতৃভূমিকে স্বৈরশাসনমুক্ত করার অদম্য নেশা জেগেছিল তরুণপ্রাণে। এমন বাংলাদেশ এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। এত কম সময়ে এত প্রাণের ক্ষয় ইতিহাসে বিরল। সেই রক্তস্নাত বিপ্লবের দিনটি আবার ফিরে এসেছে।
নির্বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গুলি করে মারা হলো, কলেজ শিক্ষার্থীদের পাখির মতো শিকার করা হলো, কোমলমতি স্কুলশিক্ষার্থীদের পবিত্র রক্তে হোলি খেলা হলো। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়ে কেড়ে নেওয়া হলো আবাসস্থলে থাকা শিশুকে পর্যন্ত। চোখের সামনে সন্তানের বুক ঝাঁজরা হতে দেখে মায়েরা কাঁদলেন, বাবারা বুক চাপড়ালেন, সহপাঠীরা ডুকরে ডুকরে আহাজারি করলেন। কষ্টে, ক্ষোভে, বেদনায় ফুঁসে উঠল দেশ। একে একে শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা শামিল হলেন শিক্ষার্থী ও তরুণদের বৈষম্যহীন সমাজ এবং রাষ্ট্র গড়ার আন্দোলনে, জীবন বাজি রাখা মুক্তির সংগ্রামে। এক বিন্দুতে দাঁড়াল গোটা বাংলাদেশ। বাইরে থাকল কেবল একদল রক্তপিপাসু হায়েনা।
আজকের দিনে ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের দেশ কাঁপানো, বিশ্ব নাড়ানো অভ্যুত্থানে যবনিকাপাত ঘটে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের। অবশ্য দুদিন আগে ৩ আগস্টেই হাসিনা তার পতনধ্বনি শুনতে পান সেনানিবাসে বিবেকবান কর্মকর্তাদের একটি সভায় জনগণের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর অবস্থান জানান দেওয়ার মধ্য দিয়ে। তারপর তিনি স্বজন-পরিজনদের পাঠিয়ে দেন দেশের বাইরে। আবার গদি আঁকড়ে থাকার শেষ চেষ্টাও চালিয়ে যান। মরণকামড় হিসেবে সারা দেশে দলীয় সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী নামিয়ে মসনদ রক্ষার শেষ চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত বিদায়ঘণ্টা বাজে আগের রাতে।
৫ আগস্ট সকালেই দাম্ভিক হাসিনার পায়ের নিচ থেকে সর্বশেষ মাটিটুকুও সরে যায়। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বরাবর লেখা পদত্যাগপত্রে সই দিয়ে দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে ছিলেন বোন শেখ রেহানা। আরো সুনির্দিষ্ট করলে দেখা যায়, সব মিলিয়ে ১৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা হাসিনার মুখোমুখি দাঁড়ানোর পর থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ২৩ দিনে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি পায় নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের কবল থেকে। যে মুক্তি কাঙ্ক্ষিত ছিল দশক ধরে।
হাসিনার করুণ পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে তার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। ভারত ও মইন-ফখরুদ্দীনদের সঙ্গে পর্দার আড়ালের বোঝাপড়ায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পাতানো নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন হাসিনা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিজের শাসনামলে আর কোনো গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন হতে দেননি। রাজতন্ত্রের আদলে সিংহাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে যারপরনাই দমন-নিপীড়ন, অত্যাচার-অনাচারে সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েই ছিল। সেটার বহিঃপ্রকাশ ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। উপলক্ষ তৈরি করে দেয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার দুঃশাসনে গুম-খুন, ভোটাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, লাগামহীন দুর্নীতি ও অর্থপাচার, দেশকে লুটেরাদের কাছে ইজারা দেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা, ঋণের নামে ব্যাংক লুটের সুযোগ দেওয়া, আয়বৈষম্য চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াসহ হিমালয়সম অপকর্মে ক্ষোভ-অসন্তোষ জমেছিল মানুষের মনে। যাবতীয় অপকর্ম ও কুকীর্তি চাপা দিতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন লুটের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে। কিন্তু শেষ সময়ে অর্থনীতিকেও নাজুক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) নেমে যায় তলানিতে, খেলাপিঋণ আকাশ ছোঁয়, দ্রব্যমূল্য চলে যায় সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে।
চব্বিশের সেই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল ‘জেনারেশন জেড’, যারা সংক্ষেপে ‘জেন-জি’ নামে পরিচিত। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এই প্রজন্ম তাদের লড়াই তাদের মতো করে করেছে। বিশেষ দিক ছিল, ছাত্রী ও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। জেন-জিদের ঠেকাতে বারবার ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। কখনো কখনো ইন্টারনেট চালু থাকলেও বন্ধ রাখা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে শিক্ষার্থীদের দমানো যায়নি। বিস্ময়করভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন আক্রান্ত হলেন, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এলেন, জীবন দিলেন অকাতরে।
বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল ও ডিজিটাল মিডিয়া যখন সরকারের কণ্ঠ হয়ে শাসকশ্রেণির ন্যারেটিভ প্রচার করছিল, অনলাইন মাধ্যমগুলো আনুগত্য কিংবা চাপে সত্যবিমুখ ছিল, তখন শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও আন্দোলনের আদর্শিক লড়াইয়ের পথ হয়ে ওঠে ফেসবুক, টুইটার। সেখানে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, স্বজন হারানোর কষ্টগাথা, পুলিশের গুলি করার ভিডিওচিত্র। তাতে যুক্ত করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের গান, দেশপ্রেমের গান, নজরুলের বিদ্রোহের কাব্য ও গান। নতুন নতুন স্লোগান, দেয়াললিখন, গ্রাফিতিও মুক্তি সংগ্রামে নতুন মাত্রা দেয়।
কৌশলগত কারণে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও রাজধানী ঘিরে জীবন-মরণ লড়াই ও বিপুল জনশক্তির যোগান দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দল। আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ এবং ১০ হাজারের অধিক রাজনৈতিক কর্মী গ্রেপ্তার করেও শেষ রক্ষা হয়নি।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা পালাবদল ছিল না; এটি ছিল সমাজ-সাংস্কৃতিক গতিধারার নতুন বাঁক; যেখানে একটি নতুন প্রজন্ম তার অতীতের সব ব্যর্থতার গ্লানি ঝেড়ে ফেলে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মমর্যাদার দাবিতে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সেটি ছিল ইতিহাসের সেই ক্ষণ, যখন বহু শোষিত, নিঃস্ব ও অপমানিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত মানুষ একযোগে বলেছিলেন, ‘নো মোর ফ্যাসিজম, এনাফ ইজ এনাফ’।
দুহাত প্রসারিত করা অকুতোভয় বীর আবু সাঈদের বুক ঝাঁজরা করা, মুগ্ধ ও ওয়াসিমদের বুলেটবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়া, আশুলিয়া থানার সামনে ভ্যানের ওপর লাশের স্তূপে আগুন দিয়ে পৈশাচিকতার চূড়ান্ত প্রদর্শন, এপিসি থেকে ইয়ামিনের লাশ নিচে ফেলে টেনেহিঁচড়ে ডিভাইডার পার করা, রিকশার পাদানিতে তরুণ নাফিসের নিথর দেহ ঝুলে থাকার দৃশ্যগুলো দুবছর পরও জনমানসে জ্বলজ্বল করছে। জাতিসংঘের হিসাবে ১৪০০ মানুষের অকাতর জীবন দান, সাড়ে পাঁচশ’ ছাত্র-জনতার দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং অঙ্গহানি-পঙ্গুত্বসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষের শারীরিক আঘাত বয়ে বেড়ানোর বিনিময়ে আজকের ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার শেষ চেষ্টা
পতনের আগের রাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনার কাছে খবর পাঠানো হচ্ছিল, ৫ আগস্ট লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে আসবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর থাকবে না। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি ও পরিণামের ভয়াবহতার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে ছিলেন বেপরোয়া। তিনি আরো রক্তপাত ঘটিয়ে, এমনকি এক লাখ লাশ ফেলে হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাহিনীগুলোকে চাপ দেন। ৪ আগস্ট অনেক রাত পর্যন্ত তিনি আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুনের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ৪ আগস্ট রাতের বৈঠকে কীভাবে পরদিনের অর্থাৎ ৫ আগস্টের আন্দোলন ও গণজমায়েত দমন করা যায়, তা নিয়ে কথা হয়। তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ‘গণভবনে বৈঠক শেষে আমরা সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে চলে যাই। তিন বাহিনীর প্রধান, লে. জেনারেল মুজিব, র্যাবের ডিজি, গোয়েন্দা সংস্থা, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও আমি নিজে ছিলাম। সেখানে ফোর্স মোতায়েন নিয়ে কথা হয়। রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় এই বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে ঢাকা শহর এবং ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশমুখে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এসব আলোচনা কাজে লাগবে না। সময় ফুরিয়ে গেছে’। এ মন্তব্যে হাসিনা ক্ষেপে যান।
গণভবনে ৫ আগস্ট সকালেও বৈঠক হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে উল্লেখ করেছেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সকালের বৈঠকে ‘তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেখিয়ে হাসিনা বলেছিলেন, ‘ওরা ভালো কাজ করছে, সেনাবাহিনী পারবে না কেন?’ তখন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘পরিস্থিতি যে পর্যায় গেছে, তাতে পুলিশের পক্ষেও আর বেশি সময় এমন কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব না। … অস্ত্র-গোলাবারুদ আর অবশিষ্ট নেই, ফোর্স টায়ার্ড হয়ে গেছে।’ এরপর সামরিক কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।’
৫ আগস্ট সকালে সামরিক কর্মকর্তারা হাসিনাকে গণভবনের অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যান বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওই কক্ষে হাসিনার কাছে সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয় এবং তাকে পদত্যাগ করতে আবার অনুরোধ করেন সামরিক কর্মকর্তারা। তারা বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ডাকে ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির কারণে গণভবন অভিমুখে ঢাকার চারপাশ থেকে মিছিল আসছে। একপর্যায়ে হাসিনাকে তার ছোট বোন শেখ রেহানা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হাসিনা রাজি (পদত্যাগে) হচ্ছিলেন না। পরে হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। জয়কে বলেন, প্রাণে বাঁচাতে হলে তার মায়ের পদত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই। সময় গুরুত্বপূর্ণ। আর এখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন জয় এবং তার কথায় ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন হাসিনা। সময়-সংকটের কারণে হাসিনাকে প্রয়োজনীয় জিনিস গোছানোর জন্য ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়। কারণ গণভবন অভিমুখে লাখ লাখ ছাত্র-জনতার মিছিল আসছিল।
দম্ভের কফিনে শেষ পেরেক
গণঅভ্যুত্থানের একদিন আগে ৩ আগস্ট ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটি দেশের ইতিহাস ও জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের গতিপথে একটি অত্যন্ত নির্ণায়ক মুহূর্ত ছিল।
বৈঠকে মূলত সেনাবাহিনীর মেজর থেকে শুরু করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার জুনিয়র ও মধ্যম সারির কর্মকর্তা এবং ইউনিট কমান্ডাররা সোচ্চার ভূমিকা নেন। সাধারণত সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তরের সুযোগ থাকে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার বক্তব্যে কারফিউ জারির পর আগের কয়েক দিনে মাঠপর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরে জুনিয়র কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনতে চান। ওই বৈঠকে জুনিয়র কর্মকর্তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন এবং জনগণের ওপর গুলি চালানোর বিষয়ে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে একাধিক কর্মকর্তা সেনাপ্রধানকে সরাসরি প্রশ্ন করেন—সামরিক বাহিনীকে কেন সাধারণ জনগণ ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে? তারা স্পষ্টভাবে বার্তা দেন যে, জনগণের ওপর ক্ষমতাসীন বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সেনাসদস্যরা গুলি চালাতে পারেন না এবং সাধারণ মানুষের ওপর বলপ্রয়োগের জন্য সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না।
কর্মকর্তারা বৈঠকে যুক্তি দেন যে, সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত এবং পুলিশের অপেশাদার আচরণের ফলে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তার দায় সেনাবাহিনীর ওপর বর্তানো উচিত নয়। সেনাবাহিনী যেন কোনোভাবেই বিতর্কিত না হয় এবং দেশের মানুষের আস্থা না হারায়, সে বিষয়ে তারা দৃঢ় অবস্থান নেন।
অনেক কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র, অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের তীব্র অসন্তোষের কথা সরাসরি তুলে ধরেন। সেনাপ্রধানও কর্মকর্তাদের অনুভূতি ও মেজাজ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেন এবং সহনশীল থাকার আহ্বান জানান।
এই বৈঠকের পরের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট ঢাকায় সেনাসদস্যদের জনগণের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। সেনা অনুশাসনের এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং সাধারণ জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করার সিদ্ধান্তটিই ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন ও গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়কে সুনিশ্চিত করে।
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
৫ আগস্ট বেলা সোয়া একটার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। তখনই মানুষ বুঝে যায়, হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়েছে। চারদিক থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তায় মানুষকে আর বাধা দেয়নি। বেলা আড়াইটায় হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরের পর লাখো মানুষের মিছিল, স্লোগানে মুখর হয় ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশ।
সেনা সদরে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান। বিকাল চারটার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে কাজ পরিচালনা করব। ধৈর্য ধরেন, সময় দেন।’ সংঘাতে দেশের ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি সবাইকে শান্তিশৃঙ্খলার পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
সেনাপ্রধান বলেন, সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে। এজন্য সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সমস্ত দায়দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনাদের জানমাল… এবং আপনাদের আমি কথা দিচ্ছি যে, আপনারা আশাহত হবেন না।’
বিকেলের দিকে জনস্রোত গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর হয়। গণভবন থেকে যে যা পেরেছেন, তা নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ গণভবনের লেকে নেমে গোসল করেছেন, কেউ কেউ মাছ ধরেছেন। অনেক তরুণ হাসিনার শয্যা কক্ষে ঢুকে বিছানায় শুয়ে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন।
বিকেলে বঙ্গভবনে বিভিন্ন দলের নেতাদের ডাকা হয়। সেখানে নতুন সরকার কীভাবে হবে, তার কাঠামো কী হবে, তা নিয়ে মতামত নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেবেন তারা।
দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় যেভাবে
৫ আগস্ট সকালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার আগে-পরে দিল্লির সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা। প্রথমে ঢাকায় সেনা পাঠিয়ে তাকে রক্ষার আবদার করেন। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ করার আবদার শুনে দিল্লি রীতিমতো ভিমরি খায় বলে জানা যায়। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানায়। সাড়া না পেয়ে হাসিনা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিমান পাঠানোর অনুরোধ করেন বার বার। আন্তর্জাতিক আইনে সেটা সম্ভব নয় বলে জানানো হয় দিল্লি থেকে। তবে সীমান্ত পার হতে পারলে যাবতীয় নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের আশ্বাস মেলে।
হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে চব্বিশের ৫ আগস্টে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। পদত্যাগপত্র তৈরি ও স্বাক্ষর করে বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত করতে বলেছিলেন। সেভাবে প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু ঢাকার প্রবেশ মুখগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ দ্রুত অগ্রসর হওয়ায় সে ঝুঁকি নিতে চায়নি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। ফলে শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে যাওয়া হয়নি তার। হাসিনা ও রেহানা কড়া নিরাপত্তা প্রহরায় গাড়িতে করে গণভবন থেকে নিকটস্থ বাণিজ্য মেলার মাঠে যান। সেখানে হেলিকপ্টারে চড়ে বেশকিছু সময় অপেক্ষা করেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাগেজ ও একাধিক ব্যক্তির জন্য। এক সময় হেলিকপ্টারে উড়ে কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর এয়ারবেসে যান। সেখান থেকে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে (সি-১৩০) তারা ভারতে যান। নয়াদিল্লির কাছের গাজিয়াবাদে (উত্তরপ্রদেশ) ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। ৫ আগস্ট দেশটির স্থানীয় সময় বিকাল পাঁচটা ৩৬ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান বলে সে দেশের গণমাধ্যমে খবর বের হয়।
বড় অর্জন
জুলাই বিপ্লব দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি তাৎক্ষণিক গড়ে ওঠা আন্দোলনের ফল নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘকাল ধরে সমাজে জমে ওঠা বঞ্চনা, বৈষম্য ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিশাল গণবিস্ফোরণ। এ সময় দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল প্রতিবাদের স্লোগান, চোখেমুখে ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রত্যয় আর হৃদয়ে বহমান ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন; একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা।
দুবছরের মাথায় সে আকাঙ্ক্ষা কতখানি পূরণ হয়েছে বা অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, হতে পারে। তবে জুলাই বিপ্লবের বড় অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের নাগপাশ থেকে মুক্তি। এখন প্রতিবেশী আগ্রাসী শক্তির চোখে চোখ রেখে সমমর্যাদার সম্পর্কের কথা বলা যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মানুষ স্বাধীনভাবে ব্যালটে সিল দিয়ে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পেরেছে। দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই নগণ্য হলেও জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে আগের মতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাচ্ছে না। মন খুলে সরকারপ্রধানের সমালোচনা করা যাচ্ছে। দেশ এখন আর পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে তকমা পাচ্ছে না। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর খবরদারি নেই আগের মতো। সংবাদমাধ্যম বহুলাংশে স্বাধীন। গুম-খুন, ক্রসফায়ার বিদায় নিয়েছে। দাবি নিয়ে মাঠে নামলেই পুলিশ এখন আর গুলির ভাষায় কথা বলতে পারছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রনিপীড়ন ও অস্ত্রবাজি শতভাগ না হলেও অনেকখানি বন্ধ হয়েছে। ব্যাংক লুট থেমেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভুল-ভ্রান্তি সত্ত্বেও অনেকটা স্থিতিশীলতা এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও এসব প্রাপ্তি উপেক্ষা করার মতো নয়। আমার দেশ