সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ন




বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রির ধুম, মোটরসাইকেলে ধস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৩৮ pm
Walton Takyon E-Bike ওয়ালটনের তাকিওন ইলেকট্রিক বাইকে মূল্যছাড়সহ আকর্ষণীয় সুবিধা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে আরও প্রকট হচ্ছে জ্বালানি তেলের সংকট। পেট্রোল-অকটেনচালিত মোটরসাইকেল-গাড়িকে পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে নতুন করে মোটরসাইকেল ও গাড়ির বিক্রিতে রীতিমতো ধস নেমেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বাজার রমরমা, বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানে তেলচালিত মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। সাধারণত প্রতি মাসে ৩০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও এপ্রিলের প্রথম ১২ দিনে বিক্রি হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার মোটরসাইকেল। বিপরীতে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের বিক্রি প্রবৃদ্ধি ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে। ক্রেতারা এখন মোটরসাইকেল ও গাড়ি কেনায় আগ্রহ না দেখিয়ে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎচালিত বাহনের দিকে ঝুঁকছেন।

মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি
দেশে মোটরসাইকেল বিক্রির তথ্য রাখে এ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বিক্রি হয়েছে তিন লাখ ১৯ হাজার ১৯৩টি মোটরসাইকেল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মোটরসাইকেল বিক্রি হয় ৩৪ হাজার ৫১৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩ হাজার ৬৫৪টি ও মার্চে ৫৪ হাজার ১২টি। মার্চ ঈদের মাস ছিল। ফলে মাসটিতে বেচাকেনা সাধারণ মাসের চেয়ে বেশি থাকে।

মোটরসাইকেল বিক্রিতে ধস

তবে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর চলতি (এপ্রিল) মাসের প্রথম ১২ দিনে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫১০টি। অর্থাৎ মার্চে যেখানে দিনে ১ হাজার ৭৫২টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, এপ্রিলে এসে দিনপ্রতি সেই বিক্রি নেমে এসেছে ৪৫৯টিতে। জ্বালানি তেলের সংকটের এ সময়ে মার্চের তুলনায় এপ্রিলে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ৭৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে দিনে বিক্রি ছিল ১ হাজার ২০১টি মোটরসাইকেল, সে হিসাবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলের প্রথম ১২ দিনে প্রায় ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছে।

বিক্রিতে এপ্রিল মাসে ধস নামলেও আগের মাসগুলোতে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। কিছুটা বিক্রি কমলেও সেটি ১০ শতাংশের বেশি ছিল না। কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, দেশে গত বছরের মার্চ মাসে প্রায় ৫৬ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। এবারও একই মাসে রোজার ঈদ হয়েছে। এবার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে ৫৪ হাজার, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় দুই হাজার কম।

অর্থাৎ, গত বছরের চেয়ে এবারের মার্চে মোটরসাইকেল বিক্রি ৪ শতাংশের মতো কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার। এবার একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ১৩ হাজার বা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘বর্তমানে মোটরসাইকেলের বাজারে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন ক্রেতারা এখন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছেন, ফলে বিক্রিতে প্রভাব পড়ছে। যারা ইতোমধ্যে কিনেছেন তারা ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে নতুন ক্রেতাদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বিক্রি কমেছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেলের বাজার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমুখী করেছে। এটি ৬০ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু তা ধীরে ধীরে রিকভারি করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের বাজার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমুখী করেছে।’

জানতে চাইলে এসিআই মোটরস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার হোসাইন মোহাম্মদ অপশন বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল বিক্রিতে ৫ থেকে ৬ শতাংশের মতো প্রভাব আছে। তবে বাজার একেবারে নেতিবাচক হয়নি, প্রত্যাশার তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে।’

ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বিক্রির দায়িত্বে থাকা এসিআই মোটরস লিমিটেডের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের আগে আমাদের বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছিল। ঈদ কেন্দ্র করে আমরা এই প্রবৃদ্ধি ৩০ শতাংশের বেশি হবে বলে আশা করেছিলাম। তবে অবস্থা আস্তে আস্তে উন্নতি দেখা যাচ্ছে।’

হোসাইন মোহাম্মদ অপশন আরও বলেন, ‘মোটরসাইকেল একটি প্রয়োজনীয় বাহন। বর্তমান পাবলিক ট্রান্সপোর্টের নিরাপত্তা ও সংকটের কারণে ক্রেতারা জ্বালানি সাশ্রয়ী বাইকের দিকে ঝুঁকছে। সেজন্য ইয়ামাহার মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটরসাইকেলের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রতি মাসে আমাদের রিটেইল গড় বিক্রি সাধারণত সাড়ে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার ইউনিট হয়। অন্যদিকে, সামগ্রিক শিল্পে ভালো সময়ে মাসিক বিক্রি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার ইউনিট এবং স্বাভাবিক সময়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার ইউনিটের মধ্যে ওঠানামা করে।’

বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ
গত বছরের নভেম্বর থেকে দেশে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে। জ্বালানি সংকটে সেই বিক্রিতে আরও বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে যেখানে মাত্র ৯৬৯টি বিদ্যুৎচালিত স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, সেখানে মার্চে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬০টিতে। ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে বিক্রি ছিল ১ হাজার ৫২৯টি, মার্চে তা বেড়ে প্রায় আড়াই হাজার ছুঁইছুঁই। অর্থাৎ বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

দেশে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের মধ্যে ইয়াদিয়া, রিভো, আকিজ, ওয়ালটন ও রাইডো উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ইয়াদিয়া স্কুটার বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে রানার। নিজেদের বিক্রি ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে দাবি করে রানার অটোমোবাইল পিএলসির চিফ বিজনেস অফিসার মুহাম্মাদ আবু হানিফ বলেন, ‘দেশে ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বেড়েছে। তেলের সংকট শুরু হওয়ার পরে আমাদের বিক্রিতে ১৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, কারণ এটা পরিবেশবান্ধব ও খরচ কম। একবার চার্জ দিলে মাত্র ১৪-১৫ টাকা খরচ হয় ও ১০০ কিলোমিটার চলে। পেট্রোলচালিত বাইকে ১ কিলোমিটার চললে সাড়ে চার টাকা খরচ হয়, আর ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ১ কিলোমিটার চললে ১৪ পয়সা খরচ হয়। জ্বালানি সংকটের কারণে মানুষ তেলের পেরেশানি থেকে বাঁচতে এখন ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের দিকে ঝুঁকছেন।’

বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের মধ্যে দেশে রাইডো ব্র্যান্ডের স্কুটারই সবচেয়ে সাশ্রয়ী। ৫০ হাজার টাকার কমেও এই ব্র্যান্ডের স্কুটার কেনা যায়। রাইডোর হেড অব মার্কেটিং শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎচালিত স্কুটার বিক্রি করছি। জ্বালানি সংকটে ক্রেতাদের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে, তাদের চাহিদা পূরণে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত মাসের চেয়ে আমাদের বিক্রি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

জ্বালানি সংকটে দেশে হাইব্রিড ও তেলচালিত গাড়ির বিক্রিও কমেছে। জানতে চাইলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের প্রভাব সব ধরনের গাড়ির বিক্রিতেই পড়েছে। বিক্রি অনেক কমে গেছে। এমনকি জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার আগেই গত বছর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ১০ হাজারের নিচে নেমে আসে, প্রায় ৯ হাজার ৭০০টির মতো, যেখানে তিন বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, বাজারটি বড় ধরনের পতনের মধ্য দিয়ে গেছে, আর জ্বালানি সংকট সেটিকে আরও তীব্র করেছে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঠিক কত শতাংশ বিক্রি কমেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে নিশ্চিতভাবে বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মোট গাড়ির বাজার বিবেচনায় কিছু ইলেকট্রিক গাড়ির বিক্রি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে, বিশেষ করে বিগত এক বছরে কয়েকশ ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে। তবে হাইব্রিড ও জ্বালানিচালিত গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’ সরকারি রাজস্ব প্রসঙ্গে আব্দুল হক বলেন, ‘গাড়ি বিক্রি কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্বও কমেছে। সরকার যদি রাজস্ব বাড়াতে চায়, তাহলে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।’

দেশে এখন নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি। প্রতিবছর গড়ে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে ছয় লাখে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা। জাগো নিউজ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD