চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে মার্চ সময়ের অস্থায়ী হিসাব অনুযায়ী দেশে বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি কিছুটা কমলেও ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সহায়তা খাতে অর্থছাড় কমে আসায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কিছুটা কমে এলেও এটি সাময়িক প্রবণতা হতে পারে। অনেক বড় প্রকল্পে চুক্তি প্রক্রিয়া, দরপত্র মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব অগ্রাধিকার পরিবর্তনের প্রভাবও পড়ছে প্রতিশ্রুতির ওপর।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উল্লিখিত সময়ে মোট বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি ৪১ লাখ মার্কিন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩০০ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতিতে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি কমেছে। এক্ষেত্রে অনুদানের পরিমাণও কমে গিয়ে ১৫ কোটি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৩৩ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। তবে ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্প সহায়তাই বিদেশি সহায়তার মূল উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। খাদ্য সহায়তার কোনো প্রতিশ্রুতি এ সময়ে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থছাড় বা ডিসবার্সমেন্টের চিত্রও কিছুটা উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়ে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৩৮৯ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৮০ কোটি ৮৮ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৯০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি কম অর্থছাড় হয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প সহায়তা খাতে অর্থছাড় কমে যাওয়ায় বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতি ধীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। চলতি অর্থবছরে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ৪ কোটি মার্কিন ডলার ছাড় হয়েছে, যা আগের বছরে ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। যদিও মোট সহায়তার তুলনায় এ খাতের অবদান খুবই সীমিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট ঋণ পরিশোধ (মূলধন ও সুদ) দাঁড়িয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, এটা আগের বছরে ছিল ৩২১ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে মূলধন পরিশোধ বেড়ে ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং সুদ পরিশোধও বেড়ে ১২৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩৮ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণের চাপ আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, দেশ এখন ধীরে ধীরে ঋণনির্ভরতা থেকে পরিশোধের চাপে প্রবেশ করছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ আরো বাড়তে পারে। তারা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে দক্ষতা বৃদ্ধি, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে চাপ আরো তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ গ্রহণে সতর্কতা এবং অনুদাননির্ভর সহায়তা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।