ঘরের মাঠে টেস্টে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং জিম্বাবুয়েকে হারালেও পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আগে কখনো জয় পায়নি বাংলাদেশ। পাকিস্তানের মাটিতে ২০২৪ সালে টেস্ট জিতে আসলেও এবারই প্রথম পাকিস্তানকে ঘরের মাঠে টেস্টে হারালো টাইগাররা। শেষ বিকেলে নাহিদ রানার তাণ্ডবে কুপোকাত হলো পাকিস্তান।
মিরপুর টেস্টে ২৬৮ রানের লক্ষ্য দিয়ে পাকিস্তানকে ১৬৩ রানে অলআউট করে দিলো নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলামরা। ফলে ১০৪ রানের ঐতিহাসিক এক জয়ের দেখা পেলো বাংলাদেশ। টেস্টে এ নিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে পেলো টানা তৃতীয় জয়। সে সঙ্গে টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মত ফাইফার নিলেন নাহিদ রানা।
মিরপুর টেস্টে জিতবে কি বাংলাদেশ! ২৬৮ রানের লক্ষ্য ছুঁড়ে দেওয়ার পর ভক্ত-সমর্থকদের কাছে ছিল এই একটাই প্রশ্ন। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শেষ বিকেলে সমর্থকদের চাওয়ার জবাবই দিতে শুরু করেন বাংলাদেশের বোলাররা।
নাহিদ রানার তাণ্ডবে উড়ে গেলো পাকিস্তান, ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের
বিশেষ করে নাহিদ রানা। বাংলাদেশের এই গতি তারকার আগুনে বোলিংয়ে একে একে পাকিস্তানের দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার সউদ শাকিল এবং মোহাম্মদ রিজওয়ান, এরপর নোমান আলি এবং শাহিন শাহ আফ্রিদি ফিরে গেলে বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।
মিরপুর টেস্টে ২৬৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৩ উইকেটে ১১৬ রান তুলে পঞ্চম দিনে চা-বিরতিতে যায় পাকিস্তান। তখনও তাদের হাতে ছিল ৭ উইকেট। সবাই ধরে নিয়েছিল, টেস্টটা ড্র হতে যাচ্ছে। কিন্তু গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা টেস্ট ক্রিকেট যে একটিমাত্র সেশনে পুরো ম্যাচের রঙ বদলে ফেলতে পারে, তা মিরপুর টেস্ট না দেখলে এখন কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না হয়তো।
শেষ সেশনে পাকিস্তানের জিততে দরকার ছিল ১৫২ রান, বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ উইকেট। এই লড়াইয়ে বাংলাদেশই এগিয়ে গেলো। শেষ সেশনে ৪ উইকেট নেন নাহিদ রানা। বাকি তিনটি ভাগাভাগি করে নেন তাইজুল ও তাসকিন আহমেদ।
তৃতীয় বা শেষ সেশনের শুরুতেই ২ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের দারুণ সুযোগ তৈরি করে বাংলাদেশ। বিরতির পর পঞ্চম বলে সেট ব্যাটার আবদুল্লাহ ফজলকে (৬৬) এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন তাইজুল ইসলাম। পরের ওভারে তাসকিন আহমেদের বলে সালমান আগা (২৬) গালিতে দেন ক্যাচ। ১২১ রানে ৫ উইকেট হারায় পাকিস্তান।
৬ষ্ঠ উইকেটে সউদ শাকিল এবং মোহাম্মদ রিজওয়ান ৩১ রানের জুটি গড়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানের ব্যাটিং বা অভিজ্ঞ জুটি বলতে ছিল এটাই। ৪৪ এবং ৪৬তম ওভারে মাত্র ১ রানের ব্যবধানে এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারকে ফিরিয়ে দিয়েই পাকিস্তানের পরাজয়ের কফিনে মূল পেরেকটা ঠুকে দেন নাহিদ রানা। ১৫২ এবং ১৫৩ রানের মাথায় পরপর ফিরে যান এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার।
এরপর ১৫৪ রানের মাথায় ৮ম উইকেট হিসেবে হাসান আলিকে এলবিডব্লিউ করে পথটা আরও সহজ করে দেন তাইজুল ইসলাম। পরের দুই ব্যাটার শুধু বাংলাদেশের জয়ের অপেক্ষা বাড়িয়েছে। নবম ব্যাটার হিসেবে নোমান আলিকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন নাহিদ রানা। সর্বশেষ শাহিন শাহ আফ্রিদিকে মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি।
ঢাকা টেস্টের পঞ্চম দিন নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। লিড নেয় ২৬৭ রানের। অর্থাৎ পাকিস্তানকে জিততে হলে করতে হবে ২৬৮ রান।
এ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় পাকিস্তান। তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারি ইমাম উল হকের (২) ব্যাট ছুঁয়ে চলে গেছে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে। ৩ রানে প্রথম উইকেট হারায় পাকিস্তান। ৬ রান নিয়ে যায় লাঞ্চ বিরতিতে।
বিরতির পর প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আজান আওয়াইজকে (১৫) বোল্ড করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ৫৭ রানে ঘটে পাকিস্তানের দ্বিতীয় উইকেটের পতন।
এরপর পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদকে থিতু হতে দেননি নাহিদ রানা। তার দুর্দান্ত গতিতে ব্যাট ছুঁইয়ে দিয়ে উইকেটরক্ষকের ক্যাচ হয়েছেন মাসুদ (২)। ৬৮ রানে ৩ উইকেট হারায় পাকিস্তান।
এর আগে চতুর্থ দিন করা ৩ উইকেট হারিয়ে ১৫২ রান নিয়ে পঞ্চম দিন সকালে খেলতে নামে বাংলাদেশ। লিড ছিল ১৭৯ রানের। সেখান থেকে ২৬৭ রানের লিড পায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
এই টেস্টে জিততে হলে শেষদিনে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দরকার ছিল বাংলাদেশের। পঞ্চম ও শেষ দিনে শুরুটা সেভাবেই হয়েছিল। তবে মুশফিকুর রহিম পারেননি ইনিংস বড় করতে।
পাকিস্তানি পেসার হাসান আলির বলে তুলে মারতে গিয়ে মিডঅফে ক্যাচ তুলে দেন তিনি, ফেরেন ২২ রান করে। পারেননি লিটন দাসও। ১১ রান করে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হয়েছেন তিনিও। শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে বাউন্ডারিতে ক্যাচ হন লিটন।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ক্যারিয়ারে তিনবার এক টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরির সুযোগ মিস ছিল নাজমুল হোসেন শান্তর। ১৩ রানের জন্য হলো না বিরল রেকর্ড।
নোমান আলীর ঘূর্ণিতে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ হন শান্ত। ১৫০ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৮৭ রানে থেমেছে তার ইনিংস। প্রথম ইনিংসে শান্ত করেছিলেন ১০১ রান। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ আউট হন ২৭ বলে ২৪ রানের ইনিংস খেলে। তারপর আর বেশি রান যোগ করতে পারেনি বাংলাদেশ।
পাকিস্তানের হাসান আলি আর নোমান আলি দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছেন ২টি করে উইকেট। টেস্টের প্রথম ইনিংসে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছিল ৪১৩ রানে। জবাবে পাকিস্তান সংগ্রহ করে ৩৮৬ রান। ২৭ রানের লিড পেয়েছিল বাংলাদেশ।