তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসা নিতে আসা আক্রান্ত প্রায় ৫৩ শতাংশ তরুণ। তাদের বড় অংশই আগে জানত না– রক্তচাপে ভুগছে। শরীরে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর বা অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে ধরা পড়ছে উচ্চ রক্তচাপ।
গত এক বছরে চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি চার হাসপাতালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ৩ হাজার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব জানা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, এসব রোগীর কেউ কেউ দৈনিক খাচ্ছেন ৭ গ্রাম লবণ। কেউ আবার ৯ গ্রাম পর্যন্ত। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের প্রভাব নীরবে পড়ছে শরীরে। বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ। দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
এমন পরিস্থিতিতে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘এক সাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি’।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শুধু অতিরিক্ত লবণ সেবন নয়; অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা, ফলোআপ, ওষুধ সেবন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল এবং পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছরে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রায় তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৮৩ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। অধিকাংশ রোগীর শরীরে লবণের মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তরুণদের বড় একটি অংশ খাবারের সঙ্গে আলাদা লবণ খায়। আবার চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে অজান্তেই শরীরে ঢুকছে অতিরিক্ত সোডিয়াম। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফাস্টফুডে অভ্যস্ততা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার প্রবণতা।
চিকিৎসকদের পর্যালোচনায় জানা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তি অনেকেই আয়োডিনযুক্ত লবণ খান না। বাজারে আয়োডিনযুক্ত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত প্রতি কেজি লবণ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়। খোলা লবণ প্রতি কেজি বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২০ টাকায়। দাম কম হওয়ায় তা লুফে নেন এক শ্রেণির ক্রেতা। তারা মূলত খেটে খাওয়া মানুষ। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে সচেতনমূলক কর্মসূচি পালন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহাম্মদ মনজুরুল আজিজ বলেন, গ্রামে মানুষ শারীরিক পরিশ্রম বেশি করে। তবে সেখানেও জাঙ্ক ফুড গ্রহণ ও আয়েশি ভাব বাড়ছে। গ্রামে রোগ নির্ণয়ের হারও কম। আবার শহরে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা থাকলেও সেই হারে শনাক্ত করা হয় না। আরেকটি উদ্বেগের বিষয়– রক্তচাপ মাপার মেশিন। হাসপাতালে মেশিনের মান সব সময় ভালো থাকে না।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. নূর-আ-আলম খান বলেন, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম না হলে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ঘুমের ঘাটতিতে গ্রেলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং লেপটিন হরমোন কমে যায়। এর ফলে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া বা অনিয়মিত ঘুমের কারণে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘসময় কম্পিউটার, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ কমে যায়, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক চাপ, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এ সমস্যা অনেক বেশি।
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শাহাবুল হুদা চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হাইপার টেনশনে ভুগছে। দিন দিন এই রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তরুণ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. আশিকুর রহমান খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নীরবে শরীরে বাসা বাঁধলেও এর পরিণতি কখনও নীরব থাকে না। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতাসহ নানা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে এই রোগ। তাই এখনই সচেতন হওয়ার সময়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, উচ্চ রক্তচাপে ভোগা রোগীর মধ্যে কম বয়সীর সংখ্যা উদ্বেগজনক। অনেকেই আগে থেকে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু বিষয়টি জানতেন না। তাই চিকিৎসা নেননি; প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করাননি। জটিলতা তৈরি হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন। চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, অনেক রোগীর শরীরে লবণের মাত্রা ৭ থেকে ৯ গ্রামের বেশি পাওয়া গেছে।
গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও কম শিক্ষিতদের ঝুঁকি বেশি
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণকারীদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও কম শিক্ষিত সংখ্যাই বেশি। অনেকেই এখনও মনে করেন, খাবারের সঙ্গে আলাদা লবণ খাওয়া স্বাভাবিক অভ্যাস। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে। অতিমাত্রায় লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি তৈরি করে বহু গুণ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে সচেতন নন।
তরুণদের জন্য বাড়তি সতর্কতার আহ্বান
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচএম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ১৮ বছর বয়সের পর অন্তত ছয় মাস পরপর রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। কিন্তু ৩০ বছর বয়সী অনেক রোগীকেও পাওয়া যায়, যারা জীবনে কখনও রক্তচাপ মাপেননি। চিকিৎসকদের পরামর্শ, খাবারে লবণ কমানো, প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তচাপ পরীক্ষা করলে ঝুঁকি অনেকটা কমবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম বলেন, জিনগত কারণ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, বয়স বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপে বড় ভূমিকা রাখে। ফাস্টফুড, এনার্জি ড্রিংকস, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও অনিয়মিত ঘুম তরুণদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বড় সমস্যা হলো, হাইপার টেনশনের সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিউর, কিডনি জটিলতা বা অন্য কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিষয়টি ধরা পড়ে। আবার অনেকে রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও নিয়মিত ওষুধ খান না। samakal