শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন




সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি, আইনজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ ১২:১৩ pm
SC সুপ্রিম কোর্ট রায় Supreme Court highcourt হাইকোর্ট আদালত
file pic

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সরকারবিরোধী আইনজীবীদের দাবি, বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ায় ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ হয়েছে। সরকার পক্ষ বলছে, আদালত অবমাননা হবে কেন? সংসদে এটা এখনও পাস হয়নি। বিএনপি বলেছে, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিল আকারে এমনভাবে আনবে, যাতে ভবিষ্যতে এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক বা সমালোচনার সুযোগ না থাকে। এখানে আদালত অবমাননার কিছু নেই। বুধবার পৃথক অবস্থান থেকে এসব বক্তব্য দেওয়া হয়।

গত মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ কর্মকর্তা ও বিচারককে মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশটি বাতিল করেছে বিএনপি সরকার।

যদিও গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিচার বিভাগ পৃথককরণের রায়ে বলেন, তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। যদিও এখনও আপিল করা হয়নি। হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষকে জানান, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে যেন সচিবালয়ে কার্যক্রম বন্ধ না করা হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে– এটা ঠিক না
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেছেন, পৃথক সচিবালয় বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, এটা ঠিক না। গতকাল এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, যেসব জুডিশিয়াল অফিসার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য নিয়োজিত ছিলেন, গেজেটের মাধ্যমে তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারণ যেহেতু অর্ডিন্যান্সটি আইনে রূপান্তরিত হয়নি, পার্লামেন্টে পাস হয়নি, সেহেতু উনারা এটা ফাংশন করেন কীভাবে? সুতরাং, স্বাভাবিকভাবে তারা মিনিস্ট্রিতে অ্যাটাচড হবেন। পরে তাদের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এর মানে এই না যে, এই আলাদা সচিবালয় বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, এটা ঠিক না।

এটা আদালত অবমাননার শামিল কিনা– সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আদালত অবমাননা হবে কেন? সংসদে এটা এখনও পাস হয়নি। বিএনপি তো বলেনি যে, এটা আর করবে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিল আকারে এমনভাবে আনবে, যাতে পরে এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক বা সমালোচনার সুযোগ না থাকে। এখানে আদালত অবমাননার কিছু নেই।

‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি পদক্ষেপকে ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। আগামী ৭ জুনের মধ্যে সরকার আপিল না করে সচিবালয় বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চেয়ে গত ২১ এপ্রিল জনস্বার্থে সাত আইনজীবী হাইকোর্টে যে রিট মামলা করেছেন, তাদের পক্ষে আছেন শিশির মনির। তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের নজরে এনেছেন।

শিশির মনির বলেন, “আমি মনে করি, তারা (সরকার) যে কাজ করেছে, এতে মারাত্মক আদালত অবমাননা হয়েছে। এই সচিবালয় স্ট্রাকচারকে তারা ডিজম্যান্টল করেছেন। এই সচিবালয়ে যাদের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। আদালতের ইচ্ছার প্রতি ‘বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা দেখানো হয়নি’। এই ধরনের আচরণ সিরিয়াসলি কনটেম্পচুয়াস। আমরা কনটেম্পট নোটিশও দিয়েছি। আগামীকালকেই একটি কনটেম্পট পিটিশন দায়ের করব।” তিনি বলেন, বিচারকদের মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি তিনি বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে এনেছেন। আদালত সারপ্রাইজড হয়েছেন। সারপ্রাইজড হয়ে বারবার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেছেন, আপনারা আমাদের সামনে কোর্টে এসে বলেছেন কোর্টের ডিজায়ারটা সেদিন রিসিভ করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল নিজে হাজির ছিলেন। তাহলে এই সমস্ত কাজ কেন করছেন?’

বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’
সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাধীন বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আইনজীবীরা। একই সঙ্গে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা বর্তমান আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বর্তমান নীরবতা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছেন তারা। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপিসমর্থিত ন্যাশনাল লয়ার্স অ্যালায়েন্সের নেতারা এসব কথা বলেন।

আইনজীবী ফোরামের নেতা জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের, বিচারকদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিতে বিএনপি সরকার খুবই বাজেভাবে একটি হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি বলেন, ‘আগের অধ্যাদেশ প্রণয়নের সঙ্গে বর্তমান আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে এই দুজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নীরবতা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ আমাদের ব্যথিত করেছে।’ সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে আপনারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না। নিয়ন্ত্রিত বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন না। ৩১ দফার যে ওয়াদা ছিল, সেটিই বাস্তবায়ন করুন।

বাসদের উদ্বেগ প্রকাশ
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার সরকারি ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। দলটি বলেছে, গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের জন্য নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা অপরিহার্য। দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে আসছে। এই গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অবিলম্বে আবার স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

গতকাল বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপিও তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, আজ সেই সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিএনপি সরকার তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ এবং জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সিদ্ধান্ত নিল। যা মোটেও দেশবাসীর কাম্য নয়।

বিবৃতিতে খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইনে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের বদলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি অবিলম্বে স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা ও তার পরিপূরক আইন প্রণয়ন করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান, গুম বন্ধ এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD