মধুমাস জ্যৈষ্ঠের আগমনী বার্তার সাথে সাথে রাজশাহীর আম বাগানগুলো এখন পাকা আমের সুবাসে মুখরিত হওয়ার অপেক্ষায়। চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমের বাম্পার ফলন এবং রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্যের আশা করছে কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় আমচাষিরা।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলায় আম বিক্রি করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেন হতে পারে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজশাহী জেলায় এ বছর মোট ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এরমধ্যে পবা উপজেলায় ৯২৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে ১১ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে।
তানোর উপজেলায় আম চাষ হয়েছে ৫২১ হেক্টর জমিতে। আম উৎপাদন হবে ৬ হাজার ৬৬৯ মেট্রিক টন।
মোহনপুর উপজেলার ৪২২ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৪০১ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। বাগমারা উপজেলায় ৫৭৫ হেক্টর থেকে ৭ হাজার ৩৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে।
দুর্গাপুর উপজেলায় ৭১০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। যা থেকে ৯ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। পুঠিয়া উপজেলায় ১৫৪৭ হেক্টর জমি থেকে ১৯ হাজার ৮০২ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলায় ১২২৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আম উৎপাদন হবে ১৫ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টন। চারঘাট উপজেলায় ৪৯০০ হেক্টর। যা থেকে ৬২ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। বাঘা উপজেলায় ৮০৭০ জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ২৯৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে।
মতিহার থানায় ৯ হেক্টর। এই জমি থেকে ১১৫২ মেট্রিন আম উৎপাদন হবে এবং বোয়ালিয়া থানায় ৭৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এখান ৯৬০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। এই আমবাগান থেকে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আম বিক্রি করে ৮০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি মৌসুমে রাজশাহীর বিখ্যাত গোপালভোগ, ল্যাংড়া, খিরসাপাত (হিমসাগর), ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনাসহ ১৯টি জাতের চাষ হয়েছে।
বিশেষ করে জেলার বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়া এলাকার কয়েকজন আমচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুদিন আগের তীব্র তাপদাহের পর সাম্প্রতিক হালকা বৃষ্টি আমের গুটি শক্ত হতে এবং দ্রুত বড় হতে দারুণ সাহায্য করেছে।
চাষিরা এখন শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা ও বাগান পাহারায় দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। যদিও ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত ১৫ থেকে গুটি আম দিয়ে আম পাড়া শুরু হয়েছে। গুটি ছাড়া অন্য আম বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
পবা উপজেলার রহিম নামে এক আমচাষি বলেন, এবার প্রথমের দিকে রোদ থাকায় কিছুটা আম ঝরে গেছে। তারপরও যে পরিমাণ আম আছে, তা যদি ঠিকঠাকভাবে বেচাকেনা করা যায় তাহলে লাভের মুখ দেখবো।
তানোর উপজেলার আমচাষি সাইমুম বলেন, এ অঞ্চলের আম খুব সুস্বাধু। আশা করছি এবার আমের ব্যবসা ভালো হবে। সবাই লাভবান হবে।
রাজশাহীর অর্থনীতি মূলত আমকেন্দ্রিক। প্রতি বছর মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আমকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
শুধু আম কেনাবেচায় নয়, এর সঙ্গে জড়িত প্লাস্টিক ক্যারেট ও বাঁশের ঝুড়ি তৈরি, কুরিয়ার সার্ভিস, পরিবহন খাত এবং হাজার হাজার দিনমজুরের কর্মসংস্থান মিলিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বিশাল গতির সঞ্চার হয়।
আমের এই বিশাল বাজারকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম নামানোর সময়সূচি নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে, যাতে ভোক্তারা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও পরিপক্ব আম পেতে পারেন।
কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কালবৈশাখী ঝড় না হলে ৮০০ কোটি টাকার এই লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসেই ছাড়িয়ে যাবে এবং চাষিরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বাসসকে বলেন, রাজশাহী জেলায় এ বছর মোট ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আম বাগান থেকে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আম বিক্রি করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া ভালো থাকলে চাষিরা আমের ভালো দাম পাবে। এই অঞ্চলের অর্থনীতির গতি সঞ্চার হবে। (বাসস)