মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন




বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

সরকারি হিসাবে লোডশেডিং কম, গ্রামে ভোগান্তির জীবন

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬ ১২:৪৩ pm
বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট বিদ্যুত power power
file pic

গত রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত দুদিনে সরকারি তথ্যমতে দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল মাত্র ৫৭৫ মেগাওয়াট। গড় লোডশেডিংও ছিল ২০০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, যা হচ্ছে তা মূলত সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ ব্যাপক। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহক। তীব্র গরমে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোডশেডিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ঝড়-বৃষ্টি, গাছ পড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়া কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন, কারণ যা-ই হোক না কেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে সেটিকে তারা কী নামে ডাকবেন?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রামে দুর্ভোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শহরের তুলনায় গ্রামের গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেশি। সরাইল উপজেলার হাওরাঞ্চল কাকরিয়া গ্রামের গ্রাম্য চিকিৎসক পবিত্র দাস জানান, প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। কয়েক দিন আগে রাত ৯টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর তা ফিরে আসে পরদিন সকালে। নোয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলামও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান।

অন্যদিকে, বিজয়নগর উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের এজিএম প্রশান্ত বিশ্বাস দাবি করেন, তাদের এলাকায় চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। তবে মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা দীপক চৌধুরী বাপ্পীর অভিযোগ, রোববার ভোরে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর তা ফিরে আসে পরদিন সকাল ৭টায়।
জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান জানান, এক সপ্তাহে প্রায় ৫০টি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে। এসব পরিবর্তন করতে গিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি হচ্ছে।

ভোলায় গ্রাহক-কর্তৃপক্ষের বিপরীত দাবি
ভোলায় গ্রাহক ঠিকমতো বিদ্যুৎ না পেলেও বিতরণকারী সংস্থার দাবি, কোনো লোডশেডিং নেই। রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়নকাজসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সদর উপজেলার ব্যাংকের হাটের ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, মুদি দোকানি মো. রফিকসহ অনেকে জানান, দিনে তিন-চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পান না ওই এলাকার গ্রাহক। চন্দ্র প্রসাদ গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, ঈদুল আজহার আগের দিন থেকে তাঁর এলাকায় টানা ৩৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। রোববার রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল। এর পর সোমবার বেলা ১১টার পর বিদ্যুৎ পান। কিন্তু আধাঘণ্টা পরপরই ট্রিপ (যাওয়া আসা) করে।

লালমোহন বাজারের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, দিনের অর্ধেক সময়ই (প্রায় ১২ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ থাকে না। সোমবার সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাঁচ/ছয়বার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করেছে। সর্বশেষ বিকেল ৫টায় বিদ্যুৎ গেছে। ৫টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসেনি।

ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম (কারিগরি) সাদেক মিয়া জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো লোডশেডিং ছিল না। বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, শুধু লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না, এমনটা নয়। উন্নয়নকাজ, মেইনটেন্যান্স, সঞ্চালন লাইনে গাছ পড়াসহ বিভিন্ন কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে।

রোববার রাত থেকে সোমবার দুপুর পযন্ত কয়েকবার ভোলা শহরে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়। তবে বিতরণকারী সংস্থা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকোশলী মো. ইউসুফ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের কোনো লোডশেডিং হয়নি। ৫/১০ মিনিটের জন্য বিদ্যুতের যাওয়া-আসাকে তিনি স্বাভাবিক বলে জানান।

কিশোরগঞ্জে লোডশেডিং স্বীকার করে না কর্তৃপক্ষ
কিশোরগঞ্জে দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে। তবে কর্তৃপক্ষ এটাকে লোডশেডিং বলতে নারাজ। তারা বলছে, এখন লোডশেডিং নেই। মাঝেমধ্যে কারিগরি সমস্যার কারণে কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে। কখনও বৃষ্টি বা বজ্রপাতের কারণে সার্কিট ব্রেকার, ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। গাছের ডাল পড়ে লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১৫ নম্বর ফিডারভুক্ত শহরের বত্রিশ এলাকার আলম সারোয়ার ও মৃদুল আহমেদ জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় রোববার সন্ধ্যা ৭টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। রাত ১১টার দিকে আধা ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর অবশ্য সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত আর বিদ্যুৎ যায়নি।

তবে পল্লী বিদ্যুতের এলাকায় বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। করিমগঞ্জ সদরের আশুতিয়াপাড়া এলাকার ফেরদৌস মিয়া ও আবুল কালাম জানিয়েছেন, আগের তুলনায় বিদ্যুৎ কম যায়। তার পরও রোববার রাত ১০টা থেকে সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার বিদ্যুৎ ছিল না মোট তিন ঘণ্টার মতো।
পল্লী বিদ্যুতের মহাব্যবস্থাপক মো. আতিকুজ্জামান জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জের পল্লী বিদ্যুতে ২৪ ঘণ্টায় চাহিদা আছে ৯০ মেগাওয়াট। এখন পুরোটাই পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যে ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যান্য যান্ত্রিক কারণেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। তবে লোডশেডিং নেই।

সিরাজগঞ্জে শহরে স্বস্তি, গ্রামে দুর্ভোগ
সিরাজগঞ্জ শহরে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক হলেও গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তি বেশি। উল্লাপাড়ার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের একটি ফিডারে রোববার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
তবে নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী অসিত কুমার পোদ্দার বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষও ঝড়ে গাছ ও বাঁশ পড়ে লাইনের ক্ষতির কারণে সাময়িক সমস্যা হয়েছে বলে জানিয়েছে।

রাঙ্গাবালীতে দিনে মাত্র ৬-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান তারা, অর্থাৎ দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফুলখালী এলাকার ফার্মেসির মালিক উজ্জ্বল সিকদার বলেন, সারাদিনই বিদ্যুৎ থাকে না। কিছুক্ষণের জন্য এলেও আবার চলে যায়। পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা অবশ্য ঝড়-বৃষ্টি ও ৩৩ কেভি লাইনের সমস্যাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ময়মনসিংহ, জয়পুরহাটে একই চিত্র
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে রোববার রাত ১০টা থেকে সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৩ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কালাইয়ে ৭ ঘণ্টা ছিল না বিদ্যুৎ
জয়পুরহাটের কালাই পৌর শহর ও আশপাশ এলাকায় গত রোববার রাত ৮টা ৯ মিনিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে টানা ৭ ঘণ্টা ৮ মিনিট পর পুনরায় চালু হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় ছিল না ৭-৮ ঘণ্টা
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় ১৮ ঘণ্টার মধ্যে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোথাও আবার সরবরাহ স্বাভাবিক
সব এলাকায় অবশ্য একই পরিস্থিতি নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, চাঁদপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঝালকাঠি, গাইবান্ধা এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় উল্লেখযোগ্য লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়নি। এসব এলাকার গ্রাহকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল।

সংসদে বিতর্ক
লোডশেডিং নিয়ে গত রোববার জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রছুল অভিযোগ করেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। নোয়াপাড়া শিল্প এলাকাতেও বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে।

জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুতের ঘাটতি না থাকলে লোডশেডিং হওয়ার প্রশ্ন নেই। ঝড়-বৃষ্টি, গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে যে সরবরাহ বন্ধ থাকে, সেটিকে লোডশেডিং বলা যাবে না। এটা বিভ্রাট।
তবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘লোডশেডিং বলি আর মেরামতশেডিং বলি; বাস্তবতা হলো, গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।’

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা) সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD