নিউ জার্সির মাঠে নরওয়ের বিপক্ষে ১-২ গোলে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ভর করে শেষ আটে পা রাখল নরওয়ে। কিন্তু পরিসংখ্যান আর ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বলছে, প্রতিপক্ষের কৃতিত্ব যেমন আছে, এই বিদায়ের পেছনে ব্রাজিলের নিজেদের ভুলও নেহায়েত কম নয়।
কী সেসব ভুল? চলুন দেখে নেওয়া যাক—
১. রক্ষণাত্মক মানসিকতা
প্রায় পুরো ম্যাচে ব্রাজিল রক্ষণাত্মক ঢঙে খেলেছে, বল দখলে এগিয়ে থাকা নরওয়েকে চাপে না ফেলে পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষায় থেকেছে। এই কৌশল একেবারেই কার্যকর হয়নি। বরং দলটিকে সারাক্ষণ প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে যে সাহসী, আক্রমণাত্মক ব্রাজিলের প্রত্যাশা ছিল, মাঠে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি।
২. পেনাল্টি নষ্ট করার মাশুল
ম্যাচের প্রথমার্ধে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ব্রুনো গিমারেস, যিনি স্টাটার-স্টেপ রান-আপ নিয়ে শট নেন এবং নরওয়ের গোলরক্ষক ইয়োরিয়ান নাইল্যান্ডকে হার মানাতে পারেননি। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রাজিলিয়ান বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করলেন। যা বলে দেয়, চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্যে দলটির ঘাটতি এখনো কাটেনি।
৩. তারুণ্যনির্ভর আক্রমণে ধার না থাকা
বদলি হিসেবে নেমে এনদ্রিক একটি সহজ সুযোগ পেয়েও বল বাইরে মেরেছেন, যা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারত। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মাঝেমধ্যে ঝলক দেখালেও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন।
৪. হালান্ডকে মার্কিং করতে ব্যর্থতা
নরওয়ের দুটি গোলই এসেছে হালান্ডের পা ও মাথা থেকে। একবার ফাঁকায় দাঁড়িয়ে বল জালে জড়িয়েছেন, আরেকবার হেডে। দুই ক্ষেত্রেই ব্রাজিলের রক্ষণভাগ তাকে ঠিকমতো নজরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারকে এভাবে বারবার একা ছেড়ে দেওয়া রীতিমতো রক্ষণের আত্মহত্যার শামিল।
৫. চাপের মুহূর্তে মানসিক দৃঢ়তার অভাব
শেষ দিকে দেরিতে পাওয়া পেনাল্টি থেকে নেইমারের গোল সমতায় ফেরানোর আশা জাগালেও, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের শরীরী ভাষায় ছিল দ্বিধা আর অস্বস্তি। বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর যে মানসিক দৃঢ়তা দরকার হয়, কাতারের পর এবারও তার ঘাটতি স্পষ্ট হলো।
৬. মাঝমাঠের ব্যর্থতা
ব্রাজিল এই ম্যাচে বলের দখল নিয়ে ছিল মোটে ৩৭ শতাংশ সময়ে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে ছিল না একেবারেই। এমন পরিস্থিতিতে পড়ার পেছনে দায়ী ছিল তাদের মাঝমাঠ। কাসেমিরো আর ব্রুনো গিমারেসরা বল পায়ে নিয়ন্ত্রণই নিতে পারেননি খেলার। যার খেসারত দিতে হয়েছে নরওয়ের হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে।
৭. নেইমারের অনুপস্থিতি
প্রশ্নটা উঠতেই পারে, নাম্বার টেন রোলে থাকা পাকেতা যখন ছিটকে গেলেন, তখন তো নেইমারকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ব্রাজিলের! সেই তাকে কি না বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি! তিনি থাকলে আর যাই হোক প্রথমার্ধের পেনাল্টিটা মিস নাও হতে পারত। সেটা হয়ে গেলেই তো স্কোরলাইনটা ২-২ হতে পারত। কিংবা কে জানে, ম্যাচটা অন্যরকম হতে পারত কি না!
সব মিলিয়ে, প্রতিভার কমতি ছিল না ব্রাজিলের স্কোয়াডে। কমতি ছিল সাহসী পরিকল্পনা, নিখুঁত ফিনিশিং আর চাপের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখার সামর্থ্যে। প্রতিপক্ষের প্রশংসার আগে, নিজেদের ভুলগুলো নিয়েই এখন আত্মসমালোচনা করার সময় এসেছে সেলেসাওদের।
(যুগান্তর)