কোরবানি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষকের স্বপ্ন এবং খামারিদের সারাবছরের পরিশ্রমের প্রতিচ্ছবিও। উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ও খামারি বছরের পর বছর ধরে গরু, ছাগল ও মহিষ লালন-পালন করেন। ঈদের আগে সেই পশু যখন ট্রাকভর্তি হাটে আসে; তখন পুরো দেশের চিত্রই বদলে যায়।
পশু পরিবহন করা মোটেও সহজ নয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে খামারি ও ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত গরম, যানজট, খাদ্য ও পানির সংকট এবং পশুর অসুস্থতা—সব মিলিয়ে হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় ভালো দামের আশায় আনা হলেও সঠিক পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে পশুর ওজন কমে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
তাই কোরবানির পশু পরিবহন শুধু একস্থান থেকে অন্যস্থানে নেওয়ার বিষয় নয়; এটি পরিকল্পিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল প্রক্রিয়া। সঠিক প্রস্তুতি ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে পশুর কষ্ট কমে, স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে নিরাপদে ও কম কষ্টে হাটে কোরবানির পশু পরিবহন করা যায়:
পশু হাটে নেওয়ার আগে নির্বাচন
সব হাটে একই দাম পাওয়া যায় না। কিছু হাটে বড় গরুর চাহিদা বেশি, কোথাও মাঝারি গরু দ্রুত বিক্রি হয়। পরিচিত ব্যবসায়ী বা আড়তদারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বর্তমানে ফেসবুক গ্রুপ, মোবাইল কল বা অনলাইন পশুর হাট থেকেও ধারণা নেওয়া যায়।
যাত্রার আগে পশুর শারীরিক অবস্থা যাচাই
যাত্রার আগে পশুর জ্বর আছে কি না; মুখে ঘা বা অতিরিক্ত লালা পড়ছে কি না; পা ফুলে আছে কি না; শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি না বা খাবারে অরুচি আছে কি না দেখে নিন। অসুস্থ পশু দীর্ঘ যাত্রা সহ্য করতে পারে না। এতে পথে মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হয়। তাই কাছের ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। একটি অসুস্থ পশু ট্রাকের অন্য পশুকেও আক্রান্ত করতে পারে।
যাত্রার আগে খাবার দেওয়া
পশুকে অতিরিক্ত ভুসি বা ভারী খাবার না দেওয়া ভালো। হালকা ঘাস ও পরিমিত পানি দিন। ট্রাকে তোলার ৪-৫ ঘণ্টা আগে ভারী খাবার বন্ধ রাখুন। অনেকে ভাবেন, বেশি খাইয়ে গাড়িতে তুললে পশু শক্তিশালী থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টোও হতে পারে। কারণ ভরা পেটে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকলে পশুর অস্বস্তি হয়, বমি হতে পারে, গ্যাস জমতে পারে। তবে পানি একেবারে বন্ধ করা যাবে না।
সঠিক যানবাহন নির্বাচন
গাড়িতে মজবুত বাঁশ বা লোহার ঘের থাকতে হবে। মেঝে পিচ্ছিল হওয়া যাবে না। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছাউনি থাকলে রোদ ও বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। অতিরিক্ত গাদাগাদি করা যাবে না। বাংলাদেশে সাধারণত ট্রাক, পিকআপ বা নৌপথ ব্যবহার করে পশু পরিবহন করা হয়। তবে সব ট্রাক পশু বহনের উপযোগী নয়। অনেক সময় অতিরিক্ত লাভের আশায় একটি ট্রাকে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পশু তোলা হয়। এতে পশু পড়ে গিয়ে আহত হয়, শ্বাসকষ্ট হয়, এমনকি মারা যায়। একটি বড় পশুর জন্য যথেষ্ট দাঁড়ানোর জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি।
ট্রাকে তোলার সময় মারধর না করা
ভয় পেলে পশু হঠাৎ লাফ দেয়। আঘাত পায়। শিং দিয়ে অন্য পশুকে আহত করে। নিজেও পড়ে যায়। দেশে সাধারণ দৃশ্য হলো লাঠি বা দড়ি দিয়ে পেটাতে পেটাতে পশু ট্রাকে তোলা হয়। এটি শুধু নিষ্ঠুর নয় বরং বিপজ্জনকও। পশুকে ধীরে ধীরে ওঠাতে হবে। প্রয়োজনে কাঠের ঢাল ব্যবহার করুন। চোখ বেঁধে দিলে অনেক সময় ভয় কমে। একজন অভিজ্ঞ মানুষ সামনে থাকলে পশু সহজে ওঠে।
যাত্রাপথে বিরতির গুরুত্ব
সম্ভব হলে নির্দিষ্ট সময় পর গাড়ি থামান। পানি খাওয়ান। পশুর অবস্থা দেখুন। অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানি ছিটিয়ে দিন। গ্রাম থেকে শহরের হাটে আসতে অনেক সময় ৮-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে। এই দীর্ঘ পথে পশুকে একটানা দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক নয়। গরম আবহাওয়ায় হিট স্ট্রোক বড় ঝুঁকি। তাই দুপুরের চেয়ে রাতের যাত্রা অনেক সময় নিরাপদ।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন
পশু পরিবহনের সময় খামারের পরিচয়পত্র, ক্রয় রসিদ, ভেটেরিনারি স্বাস্থ্য সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, পরিবহন কাগজ সঙ্গে রাখুন। অনেক জায়গায় চেকপোস্টে পুলিশ বা প্রশাসন কাগজপত্র দেখতে চায়। তাই আগে থেকেই প্রস্তুত থাকুন। এগুলো থাকলে হয়রানি কম হয়।
চাঁদাবাজি ও দালাল থেকে সতর্কতা
পশুর হাটে তারা অতিরিক্ত টোল দাবি করে। জোর করে হাটের জায়গা দিতে চায়। দালালি ছাড়া বিক্রি হবে না বলে ভয় দেখায়। কোরবানির মৌসুমে কিছু অসাধু ব্যক্তি পথে বা হাটে খামারিদের টার্গেট করে। নতুন খামারি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দালালের কারণে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন বা হাট কমিটির সহায়তা নিন। পরিচিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
হাটে পৌঁছানোর পর করণীয়
হাটে পৌঁছে পশুকে বিশ্রাম দিন। পানি খাওয়ান। শরীর পরিষ্কার করুন। খাবারের ব্যবস্থা করুন। কেননা হাটে পৌঁছেই পশু নামিয়ে বিক্রির জন্য দাঁড় করিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। অনেক খামারি গরুর গায়ে পানি মেরে চকচকে করেন। তবে অতিরিক্ত কিছু ব্যবহার না করাই ভালো। পরিষ্কার ও সুস্থ পশু ক্রেতার নজর দ্রুত কাড়ে।
পশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
পশুর নিরাপত্তায় রাতে পাহারা রাখুন। দড়ি মজবুত করুন। অপরিচিত কাউকে দায়িত্ব দেবেন না। সম্ভব হলে কয়েকজন মিলে থাকুন। অনেক সময় ঘুমের সুযোগে পশু বদল বা চুরি হয়।
অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গরুকে মোটাতাজা দেখাতে ক্ষতিকর ইনজেকশন ব্যবহার করেন। এটি পশুর জন্য বিপজ্জনক এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে লালন করা পশুর চাহিদা এখন বেশি। সচেতন ক্রেতারা এখন পশুর আচরণ, চোখ, হাঁটা সবই খেয়াল করেন।
একটু সচেতনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও মানবিক আচরণই পশুর যাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে পারে। এর মাধ্যমে পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে, ঝুঁকি কমে এবং একই সঙ্গে কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক লাভের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। jagonews