শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন




এক সিরিজ জয়ে যত অর্জন বাংলাদেশের

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ ১২:১৫ pm
Bangladesh Cricket board bcb বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি টেস্ট ক্রিকেট Test cricket bcb টেস্ট দল Cricket-Bangladesh afg bangladesh Cricket-Bangladesh bcb test
file Photo: AFP

একটি স্টাম্প মুশফিকের হাতে তুলে দেন একজন মাঠকর্মী। শেষ উইকেট নেওয়ার পরই বলটি পকেটে রেখে দেন তাইজুল ইসলাম। যে যেভাবে পারলেন সিলেট টেস্ট জয়ের স্মারক নিজের করে নিলেন ব্যক্তিগত শোকেসে রাখার জন্য। যারা কিছুই পেলেন না, তারাও স্মরণীয় মুহূর্তকে ছবির ফ্রেম করে নিলেন। তারা হয়তো এই ছবি ফেসবুকের টাইমলাইনে রেখে দেবেন, যেন প্রতিবছর মেমোরি মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের কথা। হ্যাঁ, এই টেস্ট সিরিজ জয় বাংলাদেশের কাছে ঐতিহাসিক। সিলেট টেস্ট ম্যাচটি ৭৮ রানে জিতে দেশের মাটিতে প্রথমবার হোয়াইটওয়াশ করেছে পাকিস্তানকে। পুরস্কারও মিলেছে হাতেনাতে। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ২৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম ৭ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট আগেও খেলেছে বাংলাদেশ। পাঁচ দিন মাঠে থাকার গল্প অনেক আছে। ওই ম্যাচগুলোর বেশির ভাগ শেষ হয়েছে পরাজয়ে। কখনও কখনও তৃপ্ত থাকতে হয়েছে ড্র মেনে নিয়ে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চতুর্থ আসরে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা দুটি ম্যাচই ছিল ব্যতিক্রম। এই সিরিজের প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি সেশন, প্রতিদিন জেতার চেষ্টা করেছেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। মুহূর্তের অসতর্কতায় খানিকটা পিছিয়ে গেলে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ছিল সমন্বিত। এই লড়াই এতটাই তীব্র ছিল, খাদের কিনারা থেকে রানের পাহাড়ে উঠে গেছে দল। প্রথম ইনিংসে লিটন কুমার দাস, দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিম যেখান থেকে যেভাবে সেঞ্চুরি করলেন, তাতে মাখামাখি হয়ে আছে একজন বিজয়ী ক্রিকেট সৈনিকের নিবেদন। প্রথম ইনিংসে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। ২ রানে অপরাজিত ছিলেন লিটন। সেখান থেকে তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামকে নিয়ে ১২৬ রান করেন তিনি। এই রান করার পেছনে ছিল একটি একক লড়াই। প্রতিটি ওভার সামাল দিয়েছেন নিজের ডিজাইনে। বাউন্ডারি বা ডাবল ছাড়া রান নেননি। জুটি টিকিয়ে রাখতে ষষ্ঠ বলে গিয়ে করেছেন প্রান্ত বদল। বোলারকে সামলানো, সতীর্থকে সাহস দেওয়া এবং ব্যাটিং প্ল্যান করা একজন পরিণত ব্যাটারের চরিত্রের প্রকাশ। লিটন অমন ব্যাটিং করায় প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রানের সংগ্রহ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সমন্বিত বোলিং আক্রমণ দিয়ে পাকিস্তানকে অলআউট করেছিল ২৩২ রানে। ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে। এবার ১১৫ রানে চার উইকেট হারালে ইনিংস বড় করার দায়িত্ব বর্তায় মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাসের কাঁধে। আক্রমণাত্মক লিটন ৬৯ রানে আউট হলে নতুন করে লড়াইয়ে নামেন মুশফিক। তাইজুলকে নিয়ে ৭৭ রানের একটি জুটি গড়েন। ১৩৭ রানে আউট হন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯০ রান করে বাংলাদেশ। ৪৩৭ রানের লক্ষ্য দেয় পাকিস্তানকে।

এই বিশাল রান তাড়া করে জিততে হলে বিশ্বরেকর্ড গড়তে হতো পাকিস্তানকে। টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের ইতিহাসে যে রেকর্ড নেই। চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রেকর্ডটি গড়া। ওই রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল পাকিস্তান। দুটি ৭১ রান, একটি ৯৪ রানের ইনিংসে লড়াই জমিয়েও দিয়েছিল। তাইজুল ইসলামের বাঁহাতি স্পিন জাদুতে পাকিস্তান থেমে গেছে ৩৫৮ রানে।

পাকিস্তান চতুর্থ দিন শেষ করেছিল সাত উইকেটে ৩১৬ রানে। ১২১ রানে পিছিয়ে থেকে শেষ দিন ব্যাটিংয়ে নামেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। দুজনে ৫৪ রানের জুটি গড়ে স্বাগতিক ড্রেসিংরুমে আতঙ্ক ছড়ান। একবার জীবন পেয়ে ২৮ রান করেন সাজিদ। ত্রাতা হয়ে দলীয় ৩৫৮ রানে জুটি ভাঙেন তাইজুল। ওই রানেই শরিফুল ইসলামের শিকার রিজওয়ান। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৯৪ রান। খুররম শাহজাদকে আউট করে ম্যাচের সমাপ্তি টানেন তাইজুল।

পঞ্চম দিন সকালে এক ঘণ্টা ৫ মিনিটের রোমাঞ্চকর সেশনটি ছিল উত্তাপ ছড়ানো। উঁকি দিয়েছে হারের শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত সব প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে ৭৮ রানের জয়ে আনন্দ লেখা। আশা করা হচ্ছিল, পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে উল্লাস হবে, গ্যাংস্টাররা গ্যাংনাম নৃত্য করবেন, কিন্তু তার কিছুই হলো না। নাজমুর হোসেন শান্তদের সাদামাটা উদযাপন দেখে মনে হবে, নীরবে-নিভৃতে টেস্টের বড় দল হয়ে গেছেন তারা। এখন আর একটি সিরিজ জয়ে খুশিতে আত্মহারা হন না। গতকাল বুধবার সিরিজ জয়ের উদযাপন বলতে উইকেটের কাছে এসে একটি গ্রুপ ছবি তোলা, ট্রফি নিয়ে ফ্রেমবন্দি হওয়া, বিজয় উল্লাস এবং সেই পরিচিত টিম সং গাওয়া।

বাংলাদেশ এখন টেস্টের অভিজ্ঞ একটি দল। শক্তিশালী একটি ব্যাটিং লাইনআপ আছে তার। মুমিনুল, শান্ত, মুশফিক ও লিটন ধারাবাহিক রান করছেন। এই টেস্টের দুই ইনিংসে যেমন দুজন ব্যাটার দুটি সেঞ্চুরি করেছেন দুর্দান্তভাবে। এই সিরিজ জিতে অনেকগুলো রেকর্ডের সঙ্গী হলো বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো দুই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল পাকিস্তানকে। টানা চার টেস্ট জয়ও একটি বাংলাদেশি রেকর্ড। গত বছর নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডকে, এ বছর পাকিস্তানকে দুই টেস্টে হারালেন শান্তরা। ছোটমোটো আরও কত রেকর্ডই তো আছে। এই যেমন দেশের মাটিতে প্রথমবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করাও তো রেকর্ড।

রেকর্ড গড়া ঐতিহাসিক এই সিরিজ জয়ে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার ৭ নম্বরে উন্নীত হলো বাংলাদেশ। আগের সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিং ছিল ৮ নম্বর। বাংলাদেশ ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে শ্রীলঙ্কার নিচে আর পাকিস্তানের ওপরে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের টেবিলেও জাম্প করেছে, ৯ নম্বর থেকে পাঁচে উন্নীত হয়েছে। ২৮ পয়েন্ট নিয়ে ভারতের ওপরে বাংলাদেশ। সাফল্যে মোড়ানো সিরিজের সেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম। ২১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম সিরিজ সেরা হলেন তিনি। মুশফিক দুই টেস্টের সিরিজে সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরিসহ ২৫৩ রান করেছেন। সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরিতে ১৯৫ রানে ম্যাচসেরা হয়েছেন লিটন কুমার দাস। ঢাকা টেস্টে সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি করা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ২৩২ রান নিয়ে সিরিজের মোস্ট ভ্যালুয়েবল খেলোয়াড়। এই যে দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ আর ম্যাচে ৯ উইকেট পাওয়া তাইজুল, তাঁকে দেওয়া হয়েছে সিলেট টেস্টের ভ্যালুয়েবল পুরস্কার। এই সাফল্য দেশের মানুষকে নাজমুল হোসেন শান্তদের ঈদ উপহার।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD