মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০১:০৩ অপরাহ্ন




চুক্তিতে সই যুক্তরাষ্ট্রের সম্মত ইরানও

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬ ১০:০২ am

যুদ্ধের ১০৮তম দিনে এসে একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা থাকলেও দুই পক্ষ আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় একটি চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। পরে গতকাল সোমবারই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি ইতোমধ্যে সই হয়েছে। শিগগিরই এর বিস্তারিত জানানো হবে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চুক্তি সইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি তেহরান।

ইরানের সুপ্রিম নিরাপত্তা কাউন্সিলের বরাত দিয়ে সোমবার আলজাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে ইরানও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো তেহরান এ সম্মতি জানাল। দুই পক্ষই চেষ্টা করছে এটাকে নিজ নিজ বিজয় হিসাবে দেখানোর। তেহরান বলছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর ট্রাম্প বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে আগামী শুক্রবার থেকে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।

তবে প্রকৃতপক্ষে এটাকে বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশার বিজয় হিসাবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার জেরে বাংলাদেশসহ দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তা কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে ও দাম কমে আসবে।

ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি ঘোষণার পর গতকাল সোমবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ৮২ দশমিক ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। সিএনএন জানায়, চুক্তি ঘোষণার খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৫ শতাংশ কমে গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল ১২০ ডলারে পৌঁছায়। পরে দাম ১০০ ডলারের আশপাশে ওঠানামা করতে থাকে।

এনবিসি নিউজ জানায়, প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য চুক্তির খবরটি সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সেখানে এক পোস্টে তিনি বলেন, টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি হরমুজকে টোলমুক্তভাবে খোলার পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি। পাশাপাশি নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ারও অনুমোদন দিচ্ছি। বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও।’ পরে আরেক পোস্টে তিনি বলেন, আগামী শুক্রবার চুক্তির পর মাইন অপসারণ করা হবে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের বলেছে, প্রণালিটি পুনরায় খোলার বিষয়টি পুরোপুরি ‘ইরানের ব্যবস্থাপনা’র ওপর নির্ভর করবে। গতকাল বিসিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমঝোতার বার্তার মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে পরস্পর মতপার্থক্যও লক্ষ করা যাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই লেবাননকে যুদ্ধ বন্ধের কার্যকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরান ও ওমান নিয়ন্ত্রণ করবে বলেও জানিয়েছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্টো বক্তব্য শোনা গেছে।

সম্ভাব্য এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে কাতার, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এটাকে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে চুক্তি হওয়া ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, হরমুজ প্রণালিতে কি আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলবে বাণিজ্যিক জাহাজ? ইসরাইল কি লেবাননে হামলা বন্ধ করবে? ইতোমধ্যে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় আগ্রাসন চালানোর বিষয়ে অনমনীয় অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইসরাইল। দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানিয়েছে, ইসরাইলের কট্টরপন্থি মন্ত্রী বেন গাভির এ চুক্তিতে তেল আবিবের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা দেখছেন না। টেলিগ্রামে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তিতে আমাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা চুক্তির অংশীদার নই। এটা আমাদের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করে না।’ এ সময় তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন।

চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের আরেক কট্টরপন্থি মন্ত্রী বেজালাল স্মোট্রিচ। তিনি সম্ভাব্য এ চুক্তিকে ‘ইসরাইলের জন্য মন্দ’ বলে বর্ণনা করেছেন। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, তাদের বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের পাশাপাশি গাজা ও সিরিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল চালিয়ে যেতে থাকবে। এক বিবৃতির বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, তিনি ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় নিরাপত্তা জোনে সেনা মোতায়েনের স্পষ্ট সিদ্ধান্তে রয়েছেন। এতে লেবানন ও গাজায় ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকতে পারে, যা নড়বড়ে করতে পারে চুক্তিকে।

ইরানের অভ্যন্তরেও কিছু নাগরিকের মধ্যে তীব্র ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব রয়েছে। বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ইরানের মেজর জেনারেল আলি আব্দুল্লাহি বলেছেন, শত্রুকে মোকাবিলা করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর আঙুল ট্রিগারে রয়েছে। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক আদৌ চুক্তি হবে কিনা, সেটা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন।

রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তি ঘোষণার পর ইরান সমর্থক লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরাইলে কোনো হামলা চালায়নি। লেবাননের অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে দেখা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরাইলের উচিত লেবাননে হামলা বন্ধ করা। সোমবার তিনি সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

চুক্তিতে আসলে কী থাকছে : যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিটি আগামী শুক্রবার জেনেভায় স্বাক্ষরিত হবে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এটাকে সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ বলে বর্ণনা করেছে। প্রশ্ন উঠছে-চুক্তিতে তাহলে কী আছে? ইরানের সুপ্রিম কাউন্সিলের বরাত দিয়ে গতকাল সোমবার আলজাজিরা জানায়, এ চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নৌ অবরোধ করেছে, সেটাও প্রত্যাহার করা হবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি বলেছেন, চুক্তির পর ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা হবে।

অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এমন একটা চুক্তি তিনি করতে যাচ্ছেন, যার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উচিত তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। গত রোববার তিনি লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালানোর জন্য নেতানিয়াহুর সমালোচনাও করেন। এক্সিওস জানিয়েছে, বৈরুতে হামলা নিয়ে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘অবিবেচক’ বলেও বর্ণনা করেন।

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানিয়েছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এ চুক্তিতে খুব সামান্য ইঙ্গিতই আছে। ইরানের মেহের নিউজ বলছে, চূড়ান্ত আলোচনা শুরুর আগে ইরানের জব্দ করা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার অবমুক্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ইরানের পক্ষ থেকে কে কে থাকছেন : জেনেভায় সম্ভাব্য চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ইরানের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি থাকতে পারেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তিনি ছিলেন ইরানের প্রধান মুখ। এছাড়া ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও থাকতে পারেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কারা থাকবেন, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD