পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, অর্জুনডারাসহ জেলার ৩২টি নদনদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিপৎসীমার ওপরে দুধকুমার নদের পানি কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গতকাল দুপুরের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৫৯ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। দুধকুমার নদের পানি ৫৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় দুধকুমার নদের মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং কিছু স্থানে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মালিয়ানী, তেলিয়ানীপাড়া, বড়মানী, মিয়াপাড়া, সেনপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারীসহ ২০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতে থাকা ফসল।
জেলা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণেই জেলার সব নদনদীর পানি বেড়েছে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে মুড়িয়ারহাট এলাকায় দুধকুমার নদের পাড়ে প্রায় ৩০০ মিটার অংশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ওই অংশ দিয়েই পানি ঢুকেছে। পানি বাড়তে থাকলে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নিচু স্থানটিতে জিও ব্যাগ ফেলে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে।
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙার বিষয়টি জানার পর পাউবোকে অবহিত করা হয়েছে। তারা ভাঙনকবলিত স্থান মেরামত শুরু করেছে। প্রশাসন সবসময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ঝুঁকিতে তিস্তা তীরবর্তী এলাকা
ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত রোববার রাতে লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে তিস্তা ব্যারাজের ভাটির চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং ফসলি জমি তলিয়ে যায়। পরে সোমবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করে এবং বিকেলে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় বলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তিস্তা তীরবর্তী বেশ কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলার জন্য ২২০ টন চাল এবং পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আগামী কয়েক দিন বাড়তে পারে হাওরের পানি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল জানিয়েছে, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং কুড়িগ্রামের দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনে হাওরাঞ্চল সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কয়েকটি নদনদীর পানিও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ২ থেকে ৪ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানান, মঙ্গলবার থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে এবং এ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে টানা তিন থেকে চার দিন। তিনি বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, যা উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। সমকাল
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি]