পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ‘যুগ যুগ ধরে প্রতারিত হচ্ছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারভিত্তিক সংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের আয়োজনে ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে তার এমন মন্তব্য আসে।
মাসুদ খান বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি শেয়ারের লেনদেন ‘হল্টেড’ হয়েছিল। তিনি দ্রুত সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেন।
“বর্তমান সার্ভেইলেন্স সিস্টেমে ৪৫টা ইন্ডকেটর আছে আন ইউজুয়াল ট্রেড হচ্ছে তা ধরতে। আমি দ্রুত তাদের ডাকলাম (কর্মকর্তাদের)। বললাম দ্রুত ব্যবস্থা নিতে।”
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, এতদিন এরকম পরিস্থিতিতে কমিশন প্রথমে স্টক এক্সচেঞ্জকে জানাত। তারপর তারা ব্যবস্থা নিত। তাতে ব্যবস্থা নিতে দুই মাস সময় লেগে যেত।
“এই সময়ে রোগী মারা যায়। ডিলে ইজ নট জাস্টিস। এখান থেকে আমরা বের হতে চাই। আনইউজুয়াল লেনদেন হলে, হল্টেডে হলে ইমিডিয়েট হস্তক্ষেপ করতে হবে। সেই নির্দেশনা দিয়েছি।”
এখন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন গত ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া মাসুদ খান।
তার সঙ্গে দায়িত্ব নেওয়া নতুন তিন কমিশনারের যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রশংসা করে মাসুদ খান বলেন, “কমিশনে যারা এসেছেন তারা বেসরকারি খাতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। এমন না যে তারা অবসরে গিয়েছেন। তারা বেসরকারি খাতে যে যার জায়গায় কাজ করেছেন। এই কমিশন বেসরকারি খাতের কমিশন।”
দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতেই ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মাসুদ খান বলেন, “এটা পুঁজিবাজারের জন্য রেড ফ্লাগ। বিদেশিরা এটাকে রেডফ্ল্যাগ হিসেবে দেখেন।”
এরপর লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মার তালিকাচ্যুতির শঙ্কা দূর করার উদ্যোগের কথাও বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তার ভাষ্য, এর সমাধান না হলে পরবর্তীতে বিদেশে কোনো দেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে অনেক প্রশ্ন দেখা দিত।
পুঁজিবাজারের লেনদেন ‘টি প্লাস ওয়ানে’ (এক দিনে শেয়ার ম্যাচুরড হলে পরের দিনই বিক্রি করার নির্দেশ) আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসি কাজ শুরু করেছে বলে জানান মাসুদ খান।
তিনি বলেন, “আরটিজিএস এর টেকনিক্যাল কাজগুলো তরা করবে। এর সমাধান হলেই আমরা দ্রুত টি প্লাস ওয়ানে যেতে পারব।”
পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনা-বেচা নিয়ে যে প্রচার চলে, তা বন্ধ করার কথাও বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
সেজন্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্সি’ লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, “লাইসেন্স ছাড়া কেউ শেয়ার দর নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবে না। শেয়ার কেনা-বেচা নিয়ে কেউ কথা বলতে পারবে না।”
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে পু্ঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভূক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বাজার ঘুরে দাঁড়াতে তিনটি রুলের পরিবর্তন করতে হবে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড, আইপিও রুলস এবং মার্জিন রুলস। এটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।
আগামী সপ্তাহে আইপিও রুলস সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবেন বলে জানান মাসুদ খান। নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে যারা এসেছেন, তারাই কলঙ্কিত হয়েছেন।
এজন্য আমি প্রথমে দায়িত্ব নিতে চাইনি। পরে যখন দেখলাম এই সরকার ক্যাপিটাল মার্কেটবান্ধব। আর আমাকে যিনি এই পদে আসতে বললেন, তিনি জানালেন যে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারব। এসব কথা শুনে বউয়ের সঙ্গে আলাপ করি। সে একদিন সময় নিয়ে দেশের স্বার্থে যোগদানের জন্য বলে। এরপর আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি বলেন, আমি বহুজাতিক কোম্পানি থেকে এসেছি। আমরা কাজের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পরিকল্পনায় এবং ২০ শতাংশ বাস্তবায়নে ব্যবহার করি। বিএসইসিতেও যোগদানের আগে ৩ মাস এই বাজার নিয়ে পরিকল্পনা করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বড় একটি প্রাইমারি রেগুলেটর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। কোনো একটি শেয়ারে অস্বাভাবিক দামে লেনদেন হচ্ছে। এটার জন্য তারা বিএসইসির অনুমোদন চাইতে অপেক্ষা করতে হতো। ততদিনে অস্বাভাবিক লেনদেন চলত। তখন আমরা রিয়েল-টাইম অ্যাকশন নেওয়ার জন্য ডিএসইকে ক্ষমতা দিলাম। এছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জকে সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছি। বাজারের স্বার্থে এই ডিরেগুলেশন খুবই জরুরি, যেটি আমরা করেছি। এছাড়া বন্ধ কোম্পানির লেনদেন বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সারা বিশ্বে বন্ধ কোম্পানির শেয়ার আমাদের মতো লেনদেন হওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ও পাস হওয়া বাজেটে পার্থক্যগুলো এসেছে। এটি কি আলাদিনের চেরাগ? না। এটি জন্য আমাদের পেছনে থেকে অনেক কাজ করতে হয়েছে।
চেয়ারম্যান বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড বড় না করলে বাজার এগোবে না। রিটেইল ইনভেস্টরের পক্ষে তো ভালো শেয়ারের জ্ঞান নেই। বিদেশে একটি লাইসেন্সড অ্যানালিস্ট থাকে। আমরা এটির আদলে ফাইন্যান্সিয়াল পরামর্শক সনদ দেব। ভারতে দেখবেন, একটি পানের দোকানেও মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়। আমার প্রধান টার্গেট ছিল মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড, মার্জিন ইস্যু রুলস এবং পাবলিক ইস্যু রুলস পরিবর্তন করতে হবে। বাজার ঠিক করতে হলে এগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে। একটি কোম্পানি কেন আইপিওতে আসে না। তাদের এক বস্তা কাগজ দিতে হয়। এছাড়া দেড় বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ব্যাংকে গেলে দ্রুত সময়ে অর্থ পান উদ্যোক্তারা। তাই আমরা আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করব। আমাদের এই প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতেই হবে।
আগামীতে ইউনিলিভার, ইনসেপ্টার মতো কোম্পানিকে ডাইরেক্ট লিস্টিং করা হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র সরকারি কোম্পানি ২৫ শতাংশ শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে ডাইরেক্ট লিস্টিং হতে পারে। তবে আগামীতে সব ধরনের কোম্পানি ১০ শতাংশ অফলোড করেই এমনটি হতে পারবে।
মার্জিন রুলসে বর্তমান আইনে এতগুলো শর্ত আছে, যেখানে মার্জিন ঋণ নেওয়ার সুযোগ খুবই কম। আগামী সপ্তাহের মধ্যে মার্জিন ঋণ নিয়ে একটি খসড়া প্রকাশ হবে। যেটি গেজেট আকারে প্রকাশ পেলে বাজারে খুব সহজেই মার্জিন ঋণ নেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরই অনেকের নেতিবাচক মন্তব্যের পরও বিতর্কিত ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এছাড়া বহির্বিশ্বে সম্মান রক্ষার জন্য লন্ডনে বেক্সিমকো ফার্মার তালিকাচ্যুতি ঠেকানোর উদ্যোগ নিই।
শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের চাহিদা সেটেলমেন্ট টি+১ করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। শেয়ারবাজারের অপরাধীদের জেল ও আর্থিক জরিমানা নিশ্চিত করতে কমিশন কাজ করছে বলে জানান তিনি। কারণ বর্তমানে বিএসইসি জরিমানা ও শাস্তি দিলেও তা আদালতে আটকে যায়। এ কারণে বিগত কমিশন ১,৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। এ সমস্যা সমাধানে বিএসইসি এরই মধ্যে আদালতে বিশেষ বেঞ্চ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া শেয়ারবাজারবিষয়ক ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্ড মার্কেট সক্রিয় করতে আগামীতে বন্ডকে অলটারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডের পরিবর্তে মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত করা হবে। এছাড়া ডেরিভেটিভস চালুর জন্য বিএসইসি সক্রিয় রয়েছে। এটা চালু করতেই হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএসই তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং চাকরি বাতিল করতে পারে। সেখানে বিএসইসি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তারা তাদের আইন অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করেছে। এছাড়া বিএসইসি থেকে চাকরিচ্যুতদের বিষয়ে এ মাসে সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।