কুমিল্লায় মাদকের বড় বড় চালান এবং আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দাররা গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে ভুয়া নাম পরিচয় ব্যবহার করছে। এসব প্রতারণা থানা এবং আদালতে ধরা পড়ছে না। এরই মাঝে বহু অপরাধী জামিনে বেরিয়ে উধাও হয়ে গেছে। এতে থমকে পড়েছে মামলার বিচার প্রক্রিয়া এবং বিপাকে পড়ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পুলিশের দাবি, থানাগুলোতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি না থাকায় বারবার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। এদিকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে কুমিল্লা কারা কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়েছে ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী ২৩ অপরাধী।
জানা গেছে, কুমিল্লায় মাদক, ডাকাতি ও ছিনতাইসংক্রান্ত মামলায় প্রতি মাসে গড়ে অন্তত দুই হাজার অপরাধী গ্রেফতার হচ্ছে। এর একটি অংশ বহিরাগত ও আন্তঃজেলা অপরাধী চক্রের সদস্য। বিশেষ করে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ইয়াবা ব্যবসায়ী। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেলার বাইরের অপরাধীরা ভুয়া নাম-ঠিকানা প্রদান করছে। থানাপর্যায় থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত তারা এই ভুয়া পরিচয়ই বহাল রাখে।
সম্প্রতি কারা কর্তৃপক্ষের তদন্তে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী ২৩ ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী বর্তমানে কুমিল্লা কারাগারে বন্দি থাকলেও বহু অপরাধী ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে উধাও হয়ে গেছে। অনেক অপরাধীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় ঝুঁলে আছে চার্জশিট।
পুলিশ বলছে, মূল নাম-ঠিকানা গোপন করায় অপরাধীদের অতীতের সাজা, পুরোনো পরোয়ানা কিংবা অন্য থানায় থাকা অপরাধের ইতিহাস আদালতের সামনে আসে না। ফলে অপরাধটি ‘প্রথম অপরাধ’ হিসাবে গণ্য হয় এবং অপরাধীরা দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। থানাগুলোতে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ যুক্ত আঙুলের ছাপ নেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পুলিশকে এনআইডি অনুবিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের সার্ভারের ওপর ম্যানুয়ালি নির্ভর করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। এতে জামিনে বেরিয়ে অপরাধীরা স্থায়ীভাবে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। সুত্র জানায়, প্রতিদিন বিশেষ অভিযানে শত শত অপরাধী ধরা পড়লেও বায়োমেট্রিক সুবিধার অভাবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাঙ্ক্ষিত সফলতা ধরে রাখতে পারছেন না। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিটি থানায় যদি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও পুলিশ ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিভাইস সরবরাহ করা হয়, তাহলে গ্রেফতারের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অপরাধীর প্রকৃত পরিচয় ও মামলার ইতিহাস বেরিয়ে আসবে। এতে অপরাধীদের পরিচয় লুকানোর এই ফাঁকি বন্ধ হবে এবং বিচারব্যবস্থায় দ্রুততা আসবে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ইউসুফ বুড়িচং থানায় মাদক মামলায় গ্রেফতারের পর মায়ের নাম ঠিক রেখে বনে যান আসিফ। বদলে দেন বাবার নামও। বাবার নাম নুরুল আমিনের জায়গায় দেন কামাল হোসেন। সঙ্গে বদলে ফেলেন নিজের ঠিকানাও। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ার পর বায়োমেট্রিক ব্যবহারে ধরা পড়ে পুরো ঘটনা। একই কারাগারে থাকা মাদক মামলার আসামি নাইমা বদলেছেন নাম ঠিকানা। নাইমা থেকে বনে গেছেন রুমি আক্তার। এ দুজনই শীর্ষ মাদককারবারি। কুমিল্লা কারাগার সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী ২৩ ভয়ংকর অপরাধী শনাক্ত হয়েছে। পরে বিষয়টি আদালত এবং জেলা পুলিশকে অবগত করা হয়।
(যুগান্তর)