জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে বছরে ২০৭০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। তাপপ্রবাহ, অকালমৃত্যু, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ব্যয় হিসাব করে এ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালে অতিরিক্ত গরমের কারণে নষ্ট হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৯৩০ কোটি কর্মঘণ্টা। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৮০ কোটি ডলার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: পাথওয়েজ, কস্টস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও তা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি ও অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন কেএইচআইর সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হচ্ছে। এতে ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপ বের করে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তাপপ্রবাহে
কেএইচআইর গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ তাপপ্রবাহ। ২০২৪ সালে অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় দুই হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় এক হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের। নির্মাণ শ্রমিকসহ শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর অন্যান্য পেশার মানুষও এর শিকার হচ্ছেন।
কেএইচআইর সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন-সংবেদনশীল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে বছরে ২০৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হৃদরোগ, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতাজনিত মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অতিরিক্ত গরমের দিনে ডায়রিয়া ও তাপজনিত অবসাদ বাড়ে। শীতের তুলনায় গ্রীষ্মে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মাত্রাও বেশি থাকে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এত বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা নেই। তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে বছরে ১০০ কোটি থেকে ৩৩০ কোটি ডলার সরাসরি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি
দেশের সব জেলার হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। আগের চার সপ্তাহে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঢাকার বাইরের। তবে মোট মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটেছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। গুরুতর রোগীদের অন্যান্য এলাকা থেকে ঢাকায় পাঠানোর কারণে এমনটি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নারীদের মৃত্যুঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ১ দশমিক ৮ গুণ। ৬১ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মৃত্যুঝুঁকি শিশুদের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ গুণ। গবেষকদের মতে, তাপমাত্রা ও রোগের তথ্য কাজে লাগিয়ে আগাম সতর্কতা জারি করা গেলে রোগীর চাপ বাড়ার আগেই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা সম্ভব। ডেঙ্গুর চিকিৎসায়ও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ২০২৩ সালে শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় প্রায় ১৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসার খরচ এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
দুর্যোগে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
বন্যার কারণে পানি দূষিত হয়, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি পান করার সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে ৪১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ৮২৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুর্যোগের সময় মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়।
প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের ভয়াবহ প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণের সঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। অন্য একটি হিসাবে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে ২০২২ সালে প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসুস্থতা বাড়লে পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে কমে যায় আয়। এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়ে। ২০২৩ সালে দেশের মোট চলতি স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিবারগুলো নিজেদের পকেট থেকে বহন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থ বরাদ্দেও দুর্বলতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে অর্থের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা আছে। বড় ধরনের দুর্যোগের পর স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে– এমন সুস্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাই প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সময়মতো ও কার্যকরভাবে তা ব্যয় নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নানাভাবে এবং পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
ডা. মুহিত আরও বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার, গবেষণা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। গবেষণালব্ধ প্রমাণ কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বর্ধিত জলবায়ু অর্থায়নের পক্ষে বাংলাদেশের দাবি জোরালো করতে সহায়তা করবে।
২০২৭ সালের আগেই ১৬ জেলায় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ
জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করেছে কেএইচআই। ২০২৭ সালের গরমের মৌসুমের আগেই জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তার সঙ্গে হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত সুপেয় পানি ও তরল সরবরাহ, শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বয়স্ক ব্যক্তি ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বিশ্রাম, সুপেয় পানি, ছায়াযুক্ত স্থান এবং কাজের সময় নির্ধারণের বিষয়ে আলাদা নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য আবহাওয়া ও তাপমাত্রাভিত্তিক পরামর্শ চালুর কথাও বলা হয়েছে।
বন্যাপ্রবণ এলাকায় আগাম পানি বিশুদ্ধকরণ উপকরণ ও খাবার স্যালাইন মজুত রাখা, দুর্যোগের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতি ও ডায়রিয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্ধারণ এবং বাজেটে পৃথক বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন থেকেই এ উদ্যোগ শুরু করতে বলেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি তাপপ্রবাহ ও রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি তহবিল গঠন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘোষণার সময় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পেতে স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প প্রস্তুত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ুসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব প্রতি তিন মাসে প্রকাশ এবং অর্থবছরের শুরুতেই মৌসুমি কার্যক্রমের অর্থছাড় করার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানির প্রসার এবং বায়ুদূষণ কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেএইচআই।