রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৪৬ পূর্বাহ্ন




ইউনিলিভারে একচেটিয়ায় জিম্মি ভোক্তারা?

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২২ ৮:৫৯ pm
Unilever ইউনিলিভার
file pic

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের আধিপত্য যেন আরও বেড়েছে। সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনী সামগ্রীতে একক ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর এর সুযোগেই ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে বহুজাতিক কোম্পানিটির বিরুদ্ধে।

১০ বছর আগেও ভোগ্যপণ্যের বাজারে দেশীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য ছিল। কিন্তু এরপর থেকেই কোম্পানিগুলো বাজারের চাহিদামতো পণ্যের সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে এসব কোম্পানিগুলোর বাজারে টিকে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিলিভার বাংলাদেশের মধ্যে লন্ডনভিত্তিক ৬০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ সরকারের ৪০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। আর এই সুযোগটিকে ব্যবহার করে তারা একচেটিয়া ক্ষমতা তৈরি করছে। সেই সাথে ভোগ্যপণ্যের বাজারকে তাদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এটি ভোক্তাদের অধিকার আইনের লঙ্ঘন।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, প্রতি মাসেই সাবান, শ্যাম্পু এবং প্রসাধনী পণ্যসহ দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। এমনকি সপ্তাহের ব্যবধানেও বেড়েছে দাম। গত দুই বছরে ইউনিলিভারের প্রতিটি পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে স্কয়ার, কেয়া এবং কোহিনুরের মতো দেশীয় কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, পণ্যের দাম দ্বিগুণ বাড়ানো হলেও তেমন লাভ নেই বলে দাবি করেছে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাজারের এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন। তিনি বলেন, ইউনিলিভার এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলো প্রতি মাসেই দাম বাড়াচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

দাম প্রায় দ্বিগুণ

বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই বছর আগে ইউনিলিভারের ১০০ গ্রাম লাক্স সাবানের দাম ছিল ৩০ টাকা। চলতি বছরের শুরুতে তা বেড়ে ৪০ টাকায় এবং আগস্টে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর ৫৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ১০০ গ্রাম ওজনের লাইফবয় সাবান আগে ছিল ৪০ টাকা, এখন ৫০ টাকা। হুইল লন্ড্রি সাবানের দামও ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে। ৪০ টাকার ডাভ সাবান এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।

এদিকে, স্কয়ারের ১০০ গ্রাম মেরিল সাবান বর্তমানে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই সাথে কোহিনুরের ৩৫ টাকার স্যান্ডালিনা সাবানের দাম এখন ৬৫ টাকা।

ইউনিলিভারের এক কেজি রিং ডিটারজেন্ট পাউডারের দাম এখন ১৮০ টাকা। দুই মাস আগেও এটির দাম ছিল ১২০ টাকা। এছাড়া হুইল ডিটারজেন্ট পাউডারের দাম ৩০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়।

ইউনিলিভারের ৫০০ গ্রাম ওজনের সার্ফ এক্সেলের দাম এখন ১৪৫ টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা ছিল ৯৯ টাকা। কোহিনূরের ফাস্ট ওয়াশ ডিটারজেন্ট পাউডারের দামও প্রতি কেজি ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে। ৩০০ গ্রাম ওজনের ভিম ডিশ ওয়াশিং বারের দাম ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ভিম লিকুইডের দাম ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে শ্যাম্পুর দাম

এক মাস আগে ইউনিলিভারের সানসিল্কের ১৭০ গ্রাম বোতল বিক্রি হয়েছিল ২০০ টাকা। যা এখন ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ওজনের ডাভ শ্যাম্পুর বোতল এখন ২১০-২২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের কর্পোরেট লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান মোহাম্মদ আলী ইমরান বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, শিপিং রেট, মার্কিন ডলার সংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়েছে। এসব কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে।

সপ্তাহান্তে দাম বাড়ানো

গত ছয় মাসে কোম্পানিগুলোর মধ্যে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা বিভ্রান্তিতে ফেলেছে খুচরা বিক্রেতাদেরও। তাদের অভিযোগ, ইউনিলিভার প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার বিক্রেতা মিঠু হাওলাদার জানান, দুই সপ্তাহ আগে ইউনিলিভারের বড় সাইজের সানসিল্ক গোল্ড শ্যাম্পুর বোতলের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এখন এটি ৪৫০ টাকা এবং চলতি সপ্তাহ শেষে এটি ৪৯০ টাকা হবে বলেও শুনছি।

বিক্রেতাদের মতে, গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইউনিলিভারের পণ্যের দাম। আর কোম্পানিটি যখন দাম বাড়ায়, তখন বাজারের অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলোও তা অনুসরণ করে। ফলে ব্যয়বহুল হয়ে উঠার কারণে ইউনিলিভার এবং দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের প্রতি ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

ইউনিলিভারের সেলসম্যান সজিব আহমেদ জানান, প্রতি সপ্তাহে সব পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে না। আর কোম্পানি যদি এক সপ্তাহের মধ্যে কিছু নির্বাচিত পণ্যের দাম বাড়ায়, তবে পরবর্তী সপ্তাহে একই পণ্যের দাম না বাড়িয়ে অন্য পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যেহেতু বাজারে ইউনিলিভারের প্রচুর পণ্য রয়েছে, তাই খুচরা বিক্রেতারা বলছে একই জিনিসের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে বাড়ছে।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপস অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর শামীমা আক্তার বলেন, ‘সবাই বলছে আমরা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছি; কিন্তু এটা সত্য নয়। আমরা বৈশ্বিক মূল্যের সাথে লড়াই করতে পারি না।’

দাম বাড়ার পরও কোম্পানির মুনাফা কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ আমাদের ভোক্তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে।’

খুচরা বিক্রেতাদের লাভ কমেছে

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আগে ইউনিলিভারের একটি সাবান বিক্রি করলে ৫-৬ টাকা লাভ হতো। কিন্তু এখন তা কমে ৪ টাকায় নেমে এসেছে। ইউনিলিভারের মতো অন্যান্য কোম্পানির পণ্যের ক্ষেত্রেও মুনাফা কমেছে। গ্রাহকরা বেশি মূল্য দিলেও কিন্তু আমাদের লাভ কম।

ধানমন্ডি এলাকার বিক্রেতা আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, ‘কোম্পানিগুলোর দাবি; তারাও লাভের মুখ দেখছে না। তাহলে টাকা কোথায় যাচ্ছে?’

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা পরিদর্শন করে এক মাসের মধ্যে ফলাফল জমা দেবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দ্য বিজনেস পোস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD