বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ন




এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন

এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন: বিদায় ফৌজদারি মামলার মাস্টার

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৩ ১২:৫৬ pm
Advocate Khandaker Mahbub Hossain অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব
file pic

সহকর্মী, দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধায় সিক্ত হলেন প্রয়াত আইনজীবী ও বিএনপি নেতা এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ, দলীয় কার্যালয় ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিজ বাসার কাছে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, স্বজন, সহকর্মী ও দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। সর্বশেষ জানাজার নামাজ হয় প্রায় ৬০ বছরের প্রিয় কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে। এতে হাজারো আইনজীবী, বিচারপতি অংশগ্রহণ করেন। পরে অশ্রুজলে তাকে শেষ বিদায় জানায় সহকর্মীরা।

বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী চত্বরে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, আপিল বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ হাজারো আইনজীবী অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি এডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, সাবেক সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য সচিব এডভোকেট মো. ফজলুর রহমান, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সভাপতি আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. কামরুল ইসলাম সজলসহ হাজারো আইনজীবী অংশগ্রহণ করেন।

খন্দকার মাহবুব হোসেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, খন্দকার মাহবুব হোসেন ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের, আইনাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে এই অঙ্গন থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়েছে। এটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের।

তিনি বিচারপতিদের প্রতি, আদালতের প্রতি সবসময় সম্মান দেখিয়েছেন। আদেশ বিপক্ষে গেলেও হাসতে হাসতে আদালত থেকে বের হয়েছেন। এটা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, সম্প্রতি যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদ- এই রায় আমরা দিয়েছি। এই মামলায় খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতকে শতভাগ সহযোগিতা করেছেন। তিনি সহযোগিতা না করলে এই রায় দেয়া সহজ হতো না। প্রখ্যাত ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞর মৃত্যুতে তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকাজ অর্ধদিবস বন্ধ থাকবে।

সকাল সাড়ে ৬টায় বসুন্ধরায় নিজ বাসভবনের কাছে খন্দকার মাহবুব হোসেনের প্রথম জানাজা হয়। সকাল ৯টায় তার প্রতিষ্ঠিত অন্ধদের কল্যাণে খন্দকার মাহবুব হোসেন চক্ষু হাসপাতাল, মিরপুরে (বিএনএসবি) দ্বিতীয় জানাজা হয়। বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খানসহ বিএনপি’র বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। এর আগে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ছাপড়া মসজিদে। পারিবারিক সূত্র জানায়, মরহুমের বড় ছেলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর আজ বাদ যোহর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

গত শনিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খন্দকার মাহবুব হোসেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। খন্দকার মাহবুব হোসেনের জন্ম ১৯৩৮ সালের ২০শে মার্চ। তার পৈতৃক বাড়ি বরগুনার বামনা উপজেলায়। তিনি ১৯৬৭ সালের ৩১শে জানুয়ারি আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ওই বছরের ২০শে অক্টোবর হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৭৩ সালে দালাল আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন তিনি। খন্দকার মাহবুব হোসেন চার দফায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দু’বার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে লড়তেন মাহবুব হোসেন। খ্যাতনামা এই আইনজীবী ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ এসোসিয়েশনের ভিপি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করায় কয়েকজন সহযোগীসহ ২য় দফা গ্রেপ্তার হন। সামরিক আদালতে তাদের বিচার শুরু হয়। সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি নিজেই নিজের মামলা পরিচালনা করেন এবং মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। তবে সামরিক শাসক তাকে এমএ পরীক্ষায় অংশ নিতে দেননি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে হাইকোর্টে আইনজীবীদের একটি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দেয়ার। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানসহ আইনজীবীদের নিয়ে জেলা কোর্টে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা তার বাসাকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। আলমারিতে রাখা মোটা আইনি বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখতেন গ্রেনেড।

খন্দকার মাহবুব হোসেন ১৯৩৮ সালের ২০শে মার্চ বরগুনার বামনায় জন্ম তার। প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি সেখানেই তার। পরবর্তীতে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাবস্থায় খন্দকার মাহবুব হোসেন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন। নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজে। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে আইন পাস করে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের চিহ্ন প্রসিকিউটর হিসেবে তিনি নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৭ই জুলাই তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদে চারবার (২০১০-২০১১, ২০১১-২০১২, ২০১৪-২০১৫ ২০১৫-২০১৬ সাল) নির্বাচিত হন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দুইবার (২০০৭-২০০৮ ও ২০১২-২০১৫ সাল) দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া তিনি সমাজসেবায় বহুমুখী অবদান রেখেছেন। অন্ধ ও পঙ্গুদের জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ভিটিসিবি)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি তিনি। শিশু সংগঠন কচিকাঁচার উপদেষ্টা এবং জসীম উদ্দীন পরিষদের সম্মানিত পৃষ্ঠপোষক। ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন, এশিয়ান ব্লাইন্ড ইউনিয়ন ও ঢাকা রোটারি ক্লাবের সদস্য। এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক (২০০৬), কবি নজরুল স্বর্ণপদক (২০০৭), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদকসহ (২০০৮) বিভিন্ন পদকে ভূষিত হন তিনি।

আইনজীবী হিসেবে তিনি অসংখ্য যুগান্তকারী মামলা পরিচালনা করেছেন। এরমধ্যে যাবজ্জীবন কারাদ- সম্পর্কিত মামলা (আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র, ৭৩ ডিএলআর (এডি) ২৯৮), শাজনীন হত্যা মামলা (সৈয়দ সাজ্জাদ মাইনুদ্দিন হাসান বনাম রাষ্ট্র, ৭০ ডিএলআর (এডি) ৭০), চাপা হত্যা মামলা (রাষ্ট্র বনাম খন্দকার জিল্লুর বারী, ৫৭ ডিএলআর (এডি) ১২৯), সালেহা খুকি হত্যা মামলা (এহতেশামুদ্দিন বনাম বাংলাদেশ, ৩৩ ডিএলআর (এডি) ১৫৪), আজম রেজা মামলা (রাষ্ট্র বনাম আজম রেজা, ৬২ ডিএলআর ৩৯৯), এরশাদ শিকদার বনাম রাষ্ট্র ভিডিও ক্যাসেট মামলা (খালেদা আকতার বনাম রাষ্ট্র, ৩৭ ডিএলআর ২৭৫), অন্যতম।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD