রমজান মাসে কবরের আজাব মাফ থাকে বা রমজানে মারা গেলে কবরের আজাব হয় না, এ কথা কি সঠিক?
‘রমজানে কবরের আজাব মাফ থাকে অথবা রমাযানে মারা গেলে কবরের আজাব হয় না’ ইত্যাদি কথা হাদিস সম্মত নয়। বরং হাদিস সম্মত কথা হলো- যদি কেউ দ্বীনদার ও সৎকর্মশীল অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে কবরে ফেরেশতাদের তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে শান্তি ও নিরাপদে অবস্থান করবে আর কেউ যদি দুষ্কৃতিকারী ও পাপিষ্ঠ হয় তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ- চাই সে রমজানে মারা যাক অথবা অন্য কোনো সময়।
আর যে ব্যক্তির কবরে শাস্তি হচ্ছে রমজান মাস শুরু হলে তার শাস্তি স্থগিত হয়- এমন কোনো কথাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
(আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমীন)
তবে হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখার পর সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম একটি কারণ। নিম্নে এ সংক্রান্ত দু’টি হাদিস ও শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাজ রহ. এর দুটি ফতোয়া তুলে ধরা হলো-
কবরের আজাব সংক্রান্ত হাদিস:
“বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পেছনে রেখে তার সাথীরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে,) তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়। এমন সময় তার নিকট দু’জন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তারা প্রশ্ন করেন, এই ব্যক্তি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! তার সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসূল।
তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন সে দু’টি স্থান একই সময় দেখতে পাবে।
আর কাফির বা মুনাফিক বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না কুরআন পড়ে শিখেছ।
অতঃপর তার দু’কানের মাঝখানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে আঘাত করা হবে, যাতে সে চিৎকার করে উঠবে। তার আশেপাশের সবাই তা শুনতে পাবে মানুষ ও জিন ছাড়া।
(সহিহ বুখারী (তাওহীদ) ২৩/ জানাজা (كتاب الجنائز), হা/১৩৩৮-সহিহ মুসলিম ৫১/১৭, হা/২৮৭০, আধুনিক প্রকাশনী: ১২৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ১২৫৭)
উল্লেখ্য যে, এটি সংক্ষিপ্ত হাদিস। অন্যান্য বর্ণনায়, আরও দু’টি প্রশ্ন করার কথা এসেছে। সে দু’টি হলো- তোমার রব (প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তা) কে?
তোমার দীন (ধর্ম/জীবন ব্যবস্থা) কী?
যাহোক, উক্ত হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, কবরের আজাব সত্য এবং তা রমজান কিংবা রমাযান ছাড়া অন্য যে কোনো সময়ের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ কবরের আজাব রমাযানে বন্ধ থাকবে তা উক্ত হাদিসে বলা হয়নি আর এ বিষয়ে অন্য কোনো হাদিসও আসেনি।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখার পর সে অবস্থায় মৃত্যু সংঘটিত হওয়া জান্নাতে প্রবেশের একটি কারণ:
‘কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার পর তার অবস্থায় জীবনাবসান হলে সে জান্নাতে যাবে’ এ কথা সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন: হুযাইফা রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে হেলান দিয়ে ছিলেন। তখন তিনি বললেন,
– “লা ইলা হা ইল্লাল্লা হ’ বলার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
– আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একদিন সিয়াম রাখার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
– আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কিছু দান-সদকা করার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সেও জান্নাত প্রবেশ করবে।”
[মুসনাদে আহমদ/22813, সহীহ তারগীব/৯৮৫, আলাবানী রহ. তার আহকামুল জানাইয গ্রন্থে বলেন, “এর সনদ সহিহ”]
হে আল্লাহ! কবরের আযাব থেকে আমাদের মাফ করুন। মাফ করুন। নিশ্চয় আপনার দয়া দ্বারা সব পরিবর্তন করুন।
রমাযানে মারা গেলে কবরের আজাব মাফ প্রসঙ্গে শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. বলেন,
“‘আর যদি রমাযান অথবা জুমার দিন মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরে আজাব থেকে মুক্তি পাবে’ এ ব্যাপারে কথা হলো, না (এ কথা সঠিক নয়) বরং এটি আল্লাহর উপর সমর্পিত। যদি সে দীনদারীর উপরে মৃত্যুবরণ করে তাহলে তার জন্য রয়েছে জান্নাত এবং সম্মান আর যদি আল্লাহর অবাধ্যতার উপরে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে বিপদের মুখে রয়েছে। তার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত ও রহমতের দোয়া করতে হবে।”
(শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট)
তিনি ‘নূরুন আলাদ দারব’ শীর্ষক সৌদি আরবের এক রেডিও অনুষ্ঠানে আরও বলেন,
“ঐ ব্যক্তির জন্য কবরের আজাব সাব্যস্ত যে তার উপযুক্ত-চাই সে শুক্রবারে মারা যাক অথবা রমাযান মাসে অথবা অন্য যে কোনো সময়।”
পরিশেষে অসীম দয়াময় ও করুণার আধার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট দু’আ করি, তিনি যেন আমাদেরকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে যেন রমাযান মাসে আমাদেরকে সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াতুল কুরআন, তওবা-ইস্তিগফার সহ আল্লাহর সন্তুষ্টি মূলক সৎকর্ম বেশি করে সম্পাদন করার তাওফিক দান করেন এবং এগুলোর মাধ্যমে আমাদের গুনাহগুলো মোচন করেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
IFM desk.