ঢাকা শহরের বস্তিতে বসবাস করা অর্ধেকের বেশি পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ খর্বাকৃতির।
নগরের নিম্নবিত্ত গর্ভবতী নারী-কিশোরী ও দুই বছরের কমবয়সী শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) করা এক গবেষণার ফলাফলে এ কথা উঠে এসেছে। সোমবার আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তায় অ্যাডভান্সিং সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস (অ্যাডসার্চ) প্রকল্পের আওতায় নিউট্রি-ক্যাপ শীর্ষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় ঢাকার মিরপুরের বাউনিয়াবাদ বস্তিতে বসবাসকারীদের ওপর।
সেখানকার ১৬ হাজার ৫৩২টি পরিবারের মধ্যে দুই হাজার ৮২৬টি পরিবারের অবস্থা ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্লেষণ করা হয় গবেষণায়। এই এলাকার ১৫ হাজার বিবাহিত নারীর মধ্যে গবেষণার সময়কালে গর্ভবতী ছিলেন ৭২১ জন।। গবেষণায় আরও ৪ হাজার ২০০ কিশোরী এবং প্রায় আড়াই হাজার দুই বছরের কম বয়সী শিশু অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলা হয়, বস্তিতে বাস করা অর্ধেকের বেশি পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং তাদের শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ খর্বাকৃতির। যেখানে শহরের ৫৩ শতাংশ নারী গর্ভকালে চার বা ততোধিকবার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে গর্ভকালীন সেবা পান, বস্তিতে এ হার মাত্র ৪০ শতাংশ।
গবেষকরা বলছেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও দ্রুত নগরায়নের ফলে ক্রমশ নতুন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে নগরের স্বাস্থ্য সূচক গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ভালো হলেও, শহরে বাস করা মানুষদের মধ্যে আয়ের তারতম্য ব্যাপক এবং এক্ষেত্রে বিপুল বৈষম্য রয়েছে।
প্রাথমিক গবেষণা বলছে, একীভূত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচি গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কমবয়সি শিশুদের স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। সেজন্য বস্তিতে বসবাসকারী গর্ভবতী নারী, কিশোরী এবং শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।
বাউনিয়াবাদ বস্তিতে বসবাসকারীদের চার মাসের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব পরিবারে কিছুক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা থাকলেও দারিদ্র্যতা ও অসুবিধা ছিল প্রকট। তাদের গড় আয় ২১ হাজার টাকা থাকলেও প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে ভুগেছে; খাদ্য সংকটে ভোগা পরিবারের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ কোনও না কোনওভাবে ঋণগ্রস্ত ছিল। সেইসঙ্গে ৩৯ শতাংশ পরিবারে প্রতি ঘরে তিনজনের বেশি সদস্য ঘুমাতেন, ৪২ শতাংশ পরিবারের নারীরা সংসারের আয়ে অবদান রাখতেন, এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি পরিবার প্রধান প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
নিউট্রি-ক্যাপ গবেষণা কর্মসূচিতে বস্তিতে বাস করা তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী—গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও দুই বছরের নিচের শিশুদের জন্য একীভূত সেবা প্যাকেজ চালু করা হয়। এর ফলাফল চমকপ্রদ ছিল জানিয়ে আইসিডিডিআর,বি বলেছে, কর্মসূচিতে থাকা নারীদের গড় ওজন বেড়েছিল আট দশমিক নয় কেজি, যেখানে কর্মসূচিতে না থাকাদের ছিল সাত দশমিক পাঁচ কেজি। এছাড়া নিরাপদ প্রসব বাড়ে, গর্ভপাত ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমে, কম ওজনের সন্তান জন্মের ঝুঁকিও কমে ১৬ শতাংশ।
গবেষণা কর্মসূচিতে থাকা কিশোরীদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সেইসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। এই কিশোরীদের মধ্যে ১৪ দশমিক নয় শতাংশ ছিল অপুষ্টির কারণে ক্ষীণকায়, আর ১২ দশমিক ছয় শতাংশ ছিল স্থূলকায়।
সেমিনারে গবেষক দলের প্রধান ড. মোস্তফা মাহফুজ বলেন, “এই মডেলের সফলতার পেছনে রয়েছে স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ এবং একাধিক বাধা একসঙ্গে মোকাবিলা করার সক্ষমতা।”
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত বস্তিবাসীরা । এসব ক্ষেত্রে নিউট্রি-ক্যাপের মতো মডেল শুধু কার্যকরই নয়, বরং এসব আরও বাড়ানো দরকার।”
অ্যাডসার্চ বাই আইসিডিডিআর,বির প্রকল্প পরিচালক ও আইসিডিডিআর,বি-র প্রফেসর ইমিরেটাস ড. শামস এল আরিফিন সমাপনী বক্তব্যে এই মডেলটি বড় পরিসরে সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্বের সুযোগ তুলে ধরেন।