বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত বাড়ছে চিকুনগুনিয়া আক্রান্তের সংখ্যা। যাদের মধ্যে অনেককে ভর্তি হতে হচ্ছে হাসপাতালে। অনেকে আবার কয়েক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। কোনো কোনো এলাকায় একই পরিবারে জ্বরে আক্রান্ত একাধিকজন। রক্ত পরীক্ষা করলেই পাওয়া যাচ্ছে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের অস্তিত্ব। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু যেমন আছে, তেমনি আছে বয়স্করাও। এমন পরিস্থিতিতে নগরীর ২০ এলাকায় সবচেয়ে বেশি চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে সিভিল সার্জন কার্যালয় পরিচালিত এক জরিপে। এসব এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার ‘হটস্পট’ বলছে সংস্থাটি।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, এ বছর গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় দুই হাজার ১০০ জন চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। পরীক্ষার বাইরেও হয়তো রয়ে গেছেন অনেকে। জরিপে সবচেয়ে বেশি জিকুনগুনিয়া রোগী থাকা যে ২০ এলাকা চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটি এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। এসব এলাকায় আক্রান্তের হার অনেক বেশি। আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৭০ শতাংশ এসব এলাকার বাসিন্দা। ওই ২০ হটস্পট হলো– হালিশহর, আগ্রাবাদ, বন্দর, সদরঘাট, ডবলমুরিং, খুলশী, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, কোতোয়ালি, ইপিজেড, পাহাড়তলী, চকবাজার, লালখান বাজার, বাকলিয়া, দেওয়ান বাজার, দেওয়ানহাট, ঝাউতলা, আন্দরকিল্লা, নাসিরাবাদ ও পাঠানটুলী। এর মধ্যে অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো– হালিশহর, আগ্রাবাদ, বন্দর, সদরঘাট ও ডবলমুরিং।
এদিকে জরিপের তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছে তারা। ফলে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) চিঠি দিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। চিঠিতে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে মশা মারার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা, পানি ও ময়লা-আবর্জনা যেন জমে না থাকে, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
শুধু চিকুনগুনিয়া নয়, চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গুরও প্রকোপ। নগরবাসীর অভিযোগ, এখন মশার অত্যাচার আগের চেয়ে বহু গুণ বাড়লেও ওষুধ ছিটাতে দেখা যায় না চসিকের কাউকেই। দিনের বেলায়ও ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালিত এক গবেষণায় মশার ঘনত্বের সর্বোচ্চ অস্তিত্ব মিলেছে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে, ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এমন মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমার চেয়ে বহু গুণ বেশি বলছেন গবেষকরা।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ভয়াবহ হলেও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি নেই। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু নগরীর নালা-নর্দমা, খাল, কিংবা ঘরের চারপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এখনও পরিষ্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের উপস্থিতিও প্রশ্নবিদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর চেয়ে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। সিটি করপোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে মূলত কোন কোন এলাকায় চিকুনগুনিয়ার রোগী বেশি, তা খুঁজে বের করতে একটি জরিপ পরিচালনা করেছি আমরা। এর ভিত্তিতে নগরের ২০টি এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মশা মারার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তাই চিহ্নিত এলাকার নাম উল্লেখসহ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছি। মশার বিস্তার রোধ করতে না পারলে আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।’
মশক নিধন অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিয়ে অসন্তুষ্ট খোদ সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ জন্য প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তাকে বলেছি, সুপারভাইজারদের নিয়ে বসে ওয়ার্ডভিত্তিক কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে। এ ক্ষেত্রে আমি কোনো অজুহাত শুনব না। অনেক ওয়ার্ডে মশকনিধনের কার্যক্রমও কমে গেছে। আমি আগ্রাবাদে গিয়ে যতক্ষণ ছিলাম, ততক্ষণ স্প্রে করা হয়েছে, এর পর বন্ধ। এভাবে হবে না। অভিযানগুলো তদারকি করে নিয়মিত চালাতে হবে। প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনে কেউ অবহেলা করলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।’