বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৫ অপরাহ্ন




শতকোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা

কৃষকের চোখের পানিতে ভিজছে তরমুজখেত

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৩৬ am
Watermelon Watermelon তরমুজ তরমুজ
file pic

ধারকর্জ করে ১৮ একর জমিতে তরমুজের চাষ করেছিলেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাসিন্দা মশিউর রহমান। প্রতি একর দেড় লাখ টাকা হিসাবে তার খরচ হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ফলনও এসেছিল ভালোই। সবমিলিয়ে ৩ কোটি টাকায় সব বিক্রি হবে বলে আশা করেছিলেন তিনি। তবে সেই আশা পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। ৮০ লাখ টাকার মতো তরমুজ বিক্রি হওয়ার পর আর মিলছে না ক্রেতা। দু-একজন যাওবা আসছেন, দাম বলছেন অনেক কম। ফলে খেতেই এখন পচছে মশিউরের তরমুজ। লোকসানের দায়ে পথে বসার উপক্রম।

কেবল মশিউরই নন, ক্রেতার অভাবে এখন পচছে বরিশাল অঞ্চলের কয়েক হাজার হেক্টর জমির তরমুজ। সেই সঙ্গে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার চাষি। এক হিসাব অনুযায়ী, মোট ফলনের এক-তৃতীয়াংশ তরমুজ বিক্রি হচ্ছে না এবার। যাতে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে কয়েকশ কোটি টাকা। একশ্রেণির কৃষকের হঠকারী সিদ্ধান্ত আর তরমুজ থেকে ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতির। অবস্থা এতটাই খারাপ যে লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচও উঠছে না কৃষকের। যারা মোটামুটি অবস্থাপন্ন, তারা সামলে উঠতে পারলেও ধার-কর্জ আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজ চাষ করা চাষিদের তাই কঠিন অবস্থা। কীভাবে ধার পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তায় নাওয়াখাওয়া বন্ধ অনেকের।

দেশে উৎপাদিত মোট তরমুজের শতকরা ৬৫ ভাগের জোগান দেয় বরিশাল বিভাগ। এখানকার উপকূলীয় ৬ জেলায় ফি বছরই হয় তরমুজের বাম্পার ফলন। গত বছর এই অঞ্চলের মোট ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ করেন কৃষকরা। ভালো ফলন আর লাভ বেশি হওয়ায় এ বছর আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর মধ্যে কেবল পটুয়াখালী জেলায়ই ৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে হয় তরমুজের চাষ। ১ এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ৫৪ হাজার ৫৫১ হেক্টর জমির তরমুজ কেটেছেন কৃষকরা। ফলন মিলেছে ২০ লাখ ৫৫ হাজার ৬১ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রশ্নে এই ফলন লাভজনক হলেও বিক্রি করতে গিয়ে পুড়ছে কৃষকের কপাল। আলোচ্য ফলনের এক-তৃতীয়াংশ তরমুজ এখনো পড়ে আছে কৃষকের খেতে। বিক্রি করার মতো ক্রেতা পাচ্ছেন না।

গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস এলাকার বাসিন্দা শফিকুর রহমান বলেন, এক একর জমিতে তরমুজের চাষ করতে গড়ে দেড় লাখ টাকা করে খরচ হয়। প্রতি একরে ফলন পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ১৫শ তরমুজ। হিসাব অনুযায়ী একেকটি তরমুজ উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ টাকা। বরিশাল কিংবা ঢাকার মোকামে পাঠাতে এর সঙ্গে পরিবহণ শ্রমিক, ট্রলার ভাড়া আর ওঠানো-নামানোর খরচ যোগ করলে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪০-১৫০ টাকায়। কিন্তু বর্তমানে আড়তদাররা ৯/১০ কেজি ওজনের একটি তরমুজের দাম ১৩০ টাকার বেশি দিচ্ছেন না। এতে তরমুজপ্রতি লোকসান দাঁড়াচ্ছে ১০/২০ টাকা। ১০ একর জমিতে যদি কেউ তরমুজ চাষ করে তবে তার লোকসান দাঁড়াচ্ছে সোয়া দুই লাখ টাকার বেশি। এর চেয়ে বড় কথা, লোকসানি এই দামেও তরমুজ নিতে চাচ্ছেন না শহরের পাইকাররা। ফলে বিক্রি করতে না পারায় খেতেই পচছে তরমুজ।

বরিশালের পাইকারি প্রতিষ্ঠান দত্ত বাণিজ্যালয়ের মালিক গনেশ দত্ত বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতারা নিচ্ছে না তরমুজ। যে কারণে আমরাও পড়েছি বিপাকে। আড়তে যা আছে, তাই বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এটি যেহেতু কাঁচামাল, তাই ঘরে রাখাও সম্ভব না। বেশি দিন হলেই পচে যায়।’ হঠাৎ বাজার পড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আসলে কমে গেছে। তাছাড়া ঈদে বিপুল খরচের পর এখন আর কেউ বিলাস পণ্য কিনছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দিকেই সবার ঝোঁক। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধেরও দায় রয়েছে এক্ষেত্রে। অজানা আশঙ্কায় অনেকে টাকা খরচ করছেন না। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে চলছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে স্ট্যান্ডার্ড সাইজের (৮-১০ কেজি) প্রতি পিস তরমুজ ১৩০/১৩৫ টাকায় কিনছি আমরা। প্রতি পিসে ৫ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করছি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। মাত্র দশদিন আগেও এই সাইজ ২৪০/২৫০ টাকায় কিনে একই লাভ রেখে বিক্রি করেছি। হঠাৎ বাজার পড়ে যাওয়ায় কমিয়ে দিতে হয়েছে দাম। তারপরও নিতে চাইছে না খুচরা বিক্রেতারা।’

বাজার পড়ে যাওয়ার পেছনে আরও একটি কারণের কথা জানান পাইকার কামাল হোসেন। বরিশালের পোর্ট রোডের এই আড়তদার বলেন, একশ্রেণির কৃষক আর পাইকাররা এজন্য দায়ী। বেশি লাভের আশায় রোজার সময় কাঁচা তরমুজ এনে বাজারে ছাড়েন তারা। তখন পাইকারি বাজারে স্ট্যান্ডার্ড সাইজের প্রতি পিস তরমুজ বিক্রি হয়েছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। ৫০০-৬০০ টাকায় তা খুচরা বাজারে বিক্রি করেছেন বিক্রেতারা। অথচ ক্রেতা বাসায় নিয়ে কাটার পর দেখেছেন ভেতরে সাদা। সেই তরমুজের তেমন স্বাদও ছিল না। এভাবে প্রতারিত হয়ে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তরমুজের দিক থেকে। এখন যখন পরিপক্ব হয়ে বাজারে এসেছে তরমুজ, তখন আর মিলছে না ক্রেতা।

বুধবার সকালে বরিশাল নগরী সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতীরে গিয়ে চোখে পড়ে ঘাটে বাঁধা তরমুজবোঝাই বেশ কয়েকটি ট্রলার। পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসেছে সেগুলো। বিক্রির উদ্দেশ্যে এলেও আড়তদারদের কাছ থেকে মিলছে না সাড়া। পোর্ট রোডের আড়তদার জুয়েল তালুকদার বলেন, আড়তে জমে থাকা তরমুজই বেঁচতে পারছি না, নতুন করে কিনব কী করে? পটুয়াখালীর চর কাজল থেকে ট্রলারবোঝাই তরমুজ নিয়ে আসা কৃষক রুবেল মুন্সি বলেন, ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ১১ হাজার পিস তরমুজ এনেছি। খেত থেকে ট্রলারে ওঠাতে প্রতি পিসে ৫ টাকা করে দিতে হয়েছে শ্রমিকদের। এখানে নামাতে আবার দিতে হবে প্রতি পিসে ২ টাকা। সেই সঙ্গে রয়েছে চাষের খরচ। যে পরিস্থিতি, তরমুজ বিক্রি হবে কি না সন্দেহ। অন্তত খরচ যদি উঠত, তাহলেও বেঁচে যেতাম। আরেক আড়তদার বেল্লাল হোসেন বলেন, প্রতিদিনই ২-৩টা ট্রলার এভাবে আসছে তরমুজ নিয়ে। কেউ বিক্রি করতে পারছে, কেউ পারছে না। বরিশাল ঘাটে না পেরে অনেকে আবার তরমুজ নিয়ে ছুটছে ঢাকায়।

গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবুল মুন্সি বলেন, আমার ইউনিয়নে অনেক কৃষকের এখন পথে বসার জোগাড়। কেবল ধারদেনা নয়, অনেকে স্ত্রীর সোনা বন্ধক রেখে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজের চাষ করেছে। অকাল বৃষ্টি আর শিলা বর্ষণের কারণে এমনিতেই অনেকের তরমুজখেত নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি যা আছে, তা বিক্রি করা যাচ্ছে না ক্রেতার অভাবে। সরকারিভাবে এই কৃষকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা না হলে তারা চরম বিপদে পড়বে।

পটুয়াখালী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, বিপদগ্রস্ত কৃষকদের একটা তালিকা আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করেছি আমরা। কৃষক যাতে বিপদে না পড়েন, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবে সরকার।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD