বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন




যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা

সংকটের মুখে দেশের শিল্প খাত, নানা শঙ্কা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২৪ am
Textiles Textile garment factory garments industry rmg bgmea worker germent পোশাক কারখানা রপ্তানি শিল্প শ্রমিক আরএমজি সেক্টর বিজিএমইএ poshak shilpo পোশাক খাত
file pic

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মাশুল দিচ্ছে দেশের সব উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে গভীর সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশীয় শিল্পকারখানার। বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধি, দেশে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অবৈধ মজুতের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিল্পমালিকরা কারখানা সচল রাখতে চাহিদামতো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাচ্ছেন না।

ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সময় জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর চলছে না শিল্পকারখনায়। এতে করে অনেক সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এখন গ্রীষ্মকাল, সেচের মৌসুম। ফসল উৎপাদনের সময়। কৃষকের প্রয়োজন চাহিদামতো সার। সেচ মেশিন চালাতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেলের।

কিন্তু সেই উৎপাদন খাতেও জ্বালানির সংকট প্রকট। চলমান এই বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। চ্যালেঞ্জের মুখে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা উসকে যেতে পারে।

এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং করণীয় নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, জ্বালানি সংকট উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ অথবা টাস্কফোর্স কমিটি কিংবা কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পেট্রোল ও অকটেনের একটি বড় অংশ বাই প্রডাক্ট হিসাবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া যায়। সুতরাং এই দুটি প্রডাক্ট নিয়ে সংকট হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে ডিজেল যারা অবৈধভাবে মজুত করছে তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। এ কারণে হয়তো সরকার এখনো জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি গুনছে। কিন্তু এটাও কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং এখন মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে সার উৎপাদনে প্রয়োজন হয় প্রাকৃতিক গ্যাসের। সেখানেও গ্যাসের অভাবে কারখানায় উৎপাদন প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যদিও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সার আমদানি করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই আমদানিতেও ভাটা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সাধারণত প্রতিটি বৈঠকে ইউরিয়া ও পটাশিয়ামসহ নানারকম সার আমদানির বিষয়টি অনুমোদন দিচ্ছে। কিন্তু সেই সার ঠিকমতো দেশে আনা সম্ভব কি না সেই সংশয় তৈরি হয়েছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক কলকারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপের অভাবে তারা কারখানার পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছেন। বিকল্প হিসাবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ক্ষেত্র বিশেষে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চলমান এই সংকটের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক খাত বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের অভাবে কারখানার নিজস্ব যানবাহনগুলো চলতে পারছে না। কারখানার জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এছাড়া গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার বয়লার ও ডাইং ইউনিটগুলো কাক্সিক্ষত গতিতে চলছে না। তিনি বলেন, যারা এই দুঃসময়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকট কাটাতে শিগগিরই বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মো. হাতেম বলেন, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো এখন বিকল্প পথ হিসাবে ভারত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ইউরোপে যাচ্ছে। এর ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। লিডটাইম বেড়ে যাওয়ায় কনটেইনার ভাড়াও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। এতে উৎপাদন ও রপ্তানি কমলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। শুধু তাই নয়, পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়বে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি তথ্যমতে, দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ১৮-২৪ শতাংশ সরাসরি শিল্পে এবং আরও ১০ শতাংশ গ্যাস শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কাতার ও সৌদি আরব থেকে এলএনজি এবং জ্বালানি তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্ট শিল্পের মতো খাতগুলো এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ে না, বরং পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে আমাদের ক্রয়াদেশ হ্রাসের একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ওষুধ খাতের উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এ খাতের উদ্যোক্তারা সময়মতো ওষুধ সরবরাহ করতে পারছেন না। সারা দেশে এ শিল্প খাতের ১৫ হাজার ডেলিভারি ভ্যান চলমান রয়েছে। কিন্তু ডিজেলের অভাবে তারা ঠিকমতো সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সময় পাম্পগুলোতে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সমস্যায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে মাত্র ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি বিল ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে, যা দেশের ভঙ্গুর রিজার্ভের ওপর মরণকামড় দিতে পারে। ইতোমধ্যে গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে শুধু নারায়ণগঞ্জেই ১৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেবে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের শুধু জ্বালানিই দেয় না, এটি আমাদের বড় শ্রমবাজারও। সেখানে যুদ্ধ মানেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামা, যা ডলার সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। উল্লেখ্য, চলমান সংকট ও পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটি ইতোমধ্যে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং চাহিদামতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। কমিটির পক্ষ থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD