শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন




মজুত আছে পর্যাপ্ত, তবু মানুষ পেট্রোল-অকটেন পাচ্ছে না কেন?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৫৩ pm
CNG stations CNG station Filing stations Filing station Petrol Octane Pump Price পেট্রোল অকটেন পাম্প Fuel energy জ্বালানি তেল Fuel Oil
file pic

তেলের দাম বাড়ল, সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণাও এলো। কিন্তু পাম্পের লাইন ছোট হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ নিয়ে সরকার স্বস্তির বার্তা দিলেও সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা যাচ্ছে গাড়ির দীর্ঘ সারি। সরবরাহের ঘাটতি নাকি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশে মার্চ মাসে যখন সরকার তেল রেশনিং করার ঘোষণা দেয়, এরপর থেকেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থেকে তেল কেনার প্রবণতা বেড়ে যায়। নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও ভোক্তাদের সেই বাড়তি চাহিদা কমানো সম্ভব হয়নি। এরপর সরকার রেশনিং বন্ধের ঘোষণা দিলেও পাম্পে গিয়ে ক্রেতারা এখনো পূর্ণ চাহিদার তেল পাচ্ছেন না।

তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, মূলত ভোক্তার আতঙ্ক ও অতিরিক্ত চাহিদা, দ্বিতীয়ত অসাধু ব্যবসা ও মজুতদারি এবং বিপিসির তেল বিক্রয় ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে বাংলাদেশে অকটেনের চাহিদা নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েতে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এই মহাসড়কের দুই পাশে অনেকগুলো পাম্প তার মধ্যে মাত্র দুইটা পাম্পে তেল দিচ্ছে। এত পাম্প বন্ধ কেন?

সোনারবাংলা পাম্পে অপেক্ষমাণ চালক হৃদয় বলেন, সকাল দশটার দিকে তখনও ওই পাম্পে তেল না থাকায় সরবরাহ বন্ধ ছিল। দাম বাড়ানোর পরও লাভ হয় নাই। টাকাও বেশি দেওয়া লাগতেছে সিরিয়ালেও থাকতে হচ্ছে।

তেলের জন্য অপেক্ষমাণ আরেকজন চালক ফিরোজ বলেন, অকটেন সংকটের কারণ হতে পারে সিন্ডিকেট। অনেক মোটরসাইকেল ও গ্যাসের গাড়ির চালকদের তেল নিয়ে আবার বিক্রি করার একটা প্রবণতা আমার নজরে এসেছে। হুন্ডা সিরিয়ালে নিয়ে গিয়ে তারা বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছে। তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে বাইরে আবার বেশি দামে বিক্রি করছে এরকম আছে। আবার দেখছি গ্যাসের সিলিন্ডারের গাড়ি তেল নিয়ে বাইরে বিক্রি করছে।

দিনে দুপুরে ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় গিয়ে গাড়ি থেকে অকটেন নামাতে দেখা গেছে। ক্রেতা সেজে জানতে চাইলে বলা হয় ওই তেল প্রতি লিটারের দাম আড়াইশ টাকা ।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, প্রাইভেটকারে ২০ লিটার এবং মোটরসাইকেলে পাঁচ লিটার পর্যন্ত অকটেন দেওয়া হচ্ছে। তবে পাম্পকর্মীদের উৎকোচ, অর্থাৎ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পাম্পে কেউ কেউ অতিরিক্ত তেল নিতে পারছে।

ঢাকার আসাদগেটের একটি পাম্পে ২৯ বছর ধরে কর্মরত সোহরাব হোসেন জানান, রাতে তেল শেষ হওয়ার পর গাড়ি এলে আবার দেয়া শুরু হবে। ফুয়েল পাস থাকলে মোটরসাইকেলে ১২০০ টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। প্রাইভেটকারে দুই হাজার টাকা এবং বড় গাড়িতে তিন হাজার টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। তেলটা যাতে সবাই পায় এজন্য রেশনিং করে দিচ্ছি। সব পাম্পে তেলটা যদি পায় তাহলে এই লাইনটা থাকতো না।

অকটেন সংকটের নেপথ্যে তেলের অসাধু ব্যবসা এবং মজুতদারি একটি চক্র গড়ে উঠেছে এমন অভিযোগ সরকারও করছে। সংকট শুরুর পর গত দেড় মাসে সরকার অভিযান চালিয়ে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার লিটারে তেল উদ্ধারের তথ্য জানায়, এর মধ্যে অকটেন ৪১ হাজার ৮৪৬ লিটার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অকটেন সংকটের নেপথ্যে সরবরাহ সংকট বা বিক্রয় ব্যবস্থাপনাও দায়ী করাটাও অস্বাভাবিক নয়। এমনকি অকটেনের বিক্রি ও সরবরাহে তথ্য ঘেঁটে সংকটের পেছন সরবরাহ ব্যবস্থার দায়ও নজরে আসে। কারণ আতঙ্কের কারণে বাড়তি চাহিদা তৈরি হলেও সরকার অকটেন সরবরাহ গত বছরের চাহিদার থেকে খুব বেশি বাড়িয়ে সরবরাহ করেনি।

যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর এপ্রিল মাসের ২০ তারিখের একটি তেল বরাদ্দের হিসেবে দেখা যায়, ৭৮টি ডিলার পাম্পের মধ্যে এপ্রিল মাসের প্রথম ১৬ দিনে ২৮টি ডিলারের পাম্প অকটেন বরাদ্দ সারা মাসের মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি পেয়েছে।

এপ্রিলের প্রথমার্ধে অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া পাম্পের অধিকাংশই ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের জেলার। সারাদেশে সব পাম্পে অকটেন সরবরাহ না হওয়াটা অকটেন সংকটের একটা অন্যতম কারণ বলেও অনেকে মনে করেন।

একদিকে সরকারের দাবি, তেল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। অন্যদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, তারা পর্যাপ্ত চাহিদার তেল পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, এই যে তেল সরবরাহের যে অস্পষ্টতা এটা সরকারের তথ্য দিয়ে স্পষ্ট করা উচিত। পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছে আমরা তেল পাচ্ছি না। অফিসিয়ালি বলছে না সাপ্লাই আছে। এই যে তথ্যের যে অস্বচ্ছতা এই বিষয়টি একমাত্র সরকারই নিশ্চিত করতে পারে যে তার তথ্যের বিভ্রান্তি বা ভুল কোথায়। পাম্প মালিকরা এক ধরনের কারচুপির আশ্রয় নিচ্ছে, আর বিপিসি সেটা স্পষ্টীকরণ করছে না।

তিনি আরো বলেন, সরকার দাবি করেছে আমাদের তেল আছে। তাহলে যুদ্ধের কারণে আমরা তেল পাচ্ছি না সেটা সঠিক না। যাদের কারণে আমরা তেল পাচ্ছি না, যাদের দায়িত্ব সরকারের তেল আমার হাতে পৌঁছানো, তারা ফেইল করেছে। তারা কালোবাজারে তেল পাঠাচ্ছে বা তারা তার জন্য দায়ী।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, এই সংকটের সময় পেট্রোল পাম্পগুলোর যে ভূমিকা পালন করার কথা, পদ্মা মেঘনা যমুনা বিতরণ কোম্পানিগুলোর যে ভূমিকা পালন করার কথা, বিপিসির যে ভূমিকা পালন করা দরকার তারা সেটি যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না।

এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার প্রতিদিন আরও ২০ শতাংশ অকটেনের সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়। একই নির্দেশনায় ১০ শতাংশ পেট্রোল ও দৈনিক ১০ শতাংশ ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে।

গত ২২ এপ্রিল জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দেশে ২৫ হাজার ৪২৩ টন অকটেনের মজুত রয়েছে। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা ২৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় রয়েছে। বাংলাদেশে কিছু অকটেন উৎপাদন করে এবং সংকট মাথায় রেখে অতিরিক্ত আমদানিও করছে।

বেসরকারি একুয়া রিফাইনারির পরিচালক ইরসাদ হোসেন বলেন, তাদেরও ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে তেল মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকার হয়তো ভবিষ্যতের কথা ভেবে মজুত করতে চাইছে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মজুত সক্ষমতা বাড়িয়ে তারপর সরবরাহের দিকটি চিন্তা করছে এমনটাই তার ধারণা।

তিনি আরও বলেন, সরকার বলেছে যে আপনারা আপনাদের কাছে রাখেন। যদি বেশি থাকে তাহলে আপনাদের স্টোরে আপনারা রাখতে পারেন। আমাদের যখন দরকার হবে আমরা আপনাদের বলবো, তখন আপনার ডেলিভারি দিয়েন। কিন্তু তাদের স্টোরেজ কিন্তু ফুল। ওইটা যখন কমবে তখন আমাদের কাছ থেকে নেবে ওইভাবে সরকার র‍্যাশনালাইজ করতে চাচ্ছে।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, অস্বাভাবিকভাবে ক্রেতা যদি বেড়ে যায়, তখন পেট্রোল পাম্প যে জ্বালানি ২৪ ঘণ্টায় দিত সেটা দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে তো নতুন সাপ্লাই দেয়া হয় না। পরদিন আবার দেয়া হয়। সেজন্য পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকে।

তেল সরবরাহ বাড়ানোর তথ্য দিয়ে মন্ত্রী বলেন, অকটেনে বাড়াইছি ২০ পার্সেন্ট, টেন পার্সেন্ট ডিজেলে, টেন পার্সেন্ট পেট্রোলে। সংকট সমাধানে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তেলের অভাব নেই। তেল ইমপোর্ট করে আনতেছি। তারপর যদি ব্ল্যাকমার্কেটিং হয়, আর এটা যদি জনগণসহ আমরা সবাই মিলে সচেতন না করি তাহলে তো এটা চলতেই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, প্যানিক পারচেজ ইরান যুদ্ধের পর শুরু হয়েছে। দুই মাস পার হয়েছে। প্যানিক পারচেজ মানে হঠাৎ করে ভয় থেকে মানুষ বেশি কেনে। সে ভয়তো কেটে গেছে। আমরা তো কখনো তেল নাই সেটা বলি নাই। তেল সবসময় আছে। এখনো আমার কাছে তেল আছে। যে মজুত আছে সেটা দিয়ে আগামী দেড় মাস আমি চলতে পারব, অসুবিধা নাই।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD