নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।
এদিকে আগামী ৭ জুন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। ওইদিন বিকেলে ত্রয়োদশ সংসদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বৃহস্পতিবার (৭ মে) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ৭ জুন (রোববার) বিকেল ৩টায় ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (২০২৬ সালের বাজেট) অধিবেশন আহ্বান করেছেন। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
সূত্র বলছে, প্রায় ২০ বছর পর সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী বাজেটের আকার বাড়িয়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি করার চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যেই আসন্ন বাজেটের আকার বড় হলেও করছাড় সুযোগ কমার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বলেছেন, ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিতে নেয়া হবে পদক্ষেপ।
মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের চাপ:
গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে। অপরদিকে দেশের শ্রমবাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্বের পাশাপাশি আংশিক বেকারত্বও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিই প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, নিম্ন বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের মতো নানা সমস্যার সম্মুখীন।
রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য:
প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো অনুযায়ী মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব খাত (ট্যাক্সসহ) ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা, নন-ট্যাক্স রেভিনিউ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এডিপি:
আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বরাদ্দ থাকতে পারে।
বাজেট ঘাটতি:
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপি’র প্রায় ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে প্রধানত দুই উৎসের ওপর নির্ভর করা হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ উৎস:
মোট সংগ্রহ লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।
প্রবৃদ্ধি:
আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ শতাংশ। এ অনুযায়ী দেশের মোট জিডিপি’র আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা, যা ডলারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন ডলার।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত:
বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপি’র প্রায় ২ থেকে ২.৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন প্রায় ৪.৬ শতাংশ। ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অপরদিকে স্বাস্থ্য খাতেও সরকারি ব্যয় কম হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই খাতে সরকারি বিনিয়োগ এখনো সীমিত। এ কারণে আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে অনেকেই পুনরুদ্ধারমুখী বাজেট হিসেবে দেখছেন। তবে বড় বাজেট প্রণয়নই শেষ কথা নয়Ñ এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন:
নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বেশ কয়েকটি বড় কর্মসূচি ইতিমধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, খাল পুনঃখনন এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। সরকার আগামী অর্থবছরে ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনতে চায়। এ ছাড়া প্রকৃত কৃষক, জেলে ও পশুপালনের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ দেয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রথম বছরেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া কর্মসূচির আওতায় ১২-১৪ বছর বয়সী মেধাবী ক্রীড়াবিদদের বৃত্তি দেয়া হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এসব খাতে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটের আকার ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চাভিলাষী হলেও সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) মাসব্যাপী প্রাক-আলোচনা শেষ হয়েছে। সারা দেশের ব্যবসায়ীদের দাবি ও প্রস্তাব শুনেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। ব্যবসায়ীদের করছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ভোগান্তি কমানোর আশ্বাস।
গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা নিয়ে বিএনপি এবার বাজেট দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ভয়াবহতা। এর মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আছে, যা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত হবে অগ্রাধিকার ঠিক করা।