এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। তাদের ৭৫ বছর বয়সী মা নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন নিঃসঙ্গ। রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি বাসায় থাকতেন তিনি। একই বাসায় নুরজাহান বেগমের মেয়েও থাকেন। বাসার একটি কক্ষে মারা যান নুরহাজান। মৃত্যুর পর চার থেকে পাঁচদিন তার লাশ পড়ে ছিল সেখানে। মরদেহে পচন ধরে মাংস খসে পড়ছিল শরীর থেকে। এই অবস্থায়ই লাশ উদ্ধার করা হয়। উচ্চ শিক্ষিত সন্তানদের মায়ের এই করুণ পরিণতি নাড়া দিয়েছে সর্বত্র। কোলে-পিঠে মানুষ করা সন্তানদের মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যে ঘরে নুরজাহান বেগমের মরদেহ পড়ে ছিল সেই কক্ষের দৃশ্য দেখেও অনেকে আঁতকে উঠেছেন।
নুরজাহান বেগমের এই পরিণতির দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যা দেখে বাকরুদ্ধ হয়েছেন। নুরজাহান বেগমের সন্তানদের প্রতি ধিক্কার ও ঘৃণা প্রকাশ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ঘটনাকে পরিবার ও সমাজব্যবস্থায় পচনের লক্ষণ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
পুলিশ বলছে, বাসাটি ওই বৃদ্ধার মেয়ের। তার জামাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মেয়েও একটি স্কুলের শিক্ষক। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েটের শিক্ষক সন্তান ওই বাড়িতে গেলেও যুগ্ম সচিব ছেলে সেখানে যাননি। পুলিশ জানায়, মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় পল্লবী থানা পুলিশ।
রোববার নুরজাহান বেগমের মেয়ে তার মাকে ডাকতে গেলে সাড়া না পেয়ে একজন নার্সকে ডাকেন। তিনি ভেবেছিলেন তার মা অসুস্থ। পরে নার্স বাসায় এসে দেখতে পান তিনি মারা গেছেন। জানতে পেয়ে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে খবর দিলে পুলিশ বৃদ্ধার পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক)। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পুরো বাসাটি ছিল নোংরা, পরিত্যক্ত ও অগোছালো।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাশির বলেন, লাশটি দেখে মনে হয়েছে এই বৃদ্ধা ৩-৪ দিন আগে মারা গেছেন। শরীরে পচন ধরে মাংস খুলে পড়ছিল। সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওসি বলেন, ওই বৃদ্ধা বাসার যে কক্ষে থাকতেন সেটি আবর্জনায় ভরা ছিল। দেখে মনে হয়েছে বছরে কেউ সেখানে প্রবেশ করেনি। মরে কয়েকদিন পড়ে থাকলেও মেয়ে খোঁজ নেননি মায়ের। মৃতের এক ছেলে যুগ্ম সচিব এবং আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। তারা পরিবারসহ অন্যত্র থাকতেন। তিনি বলেন, রোববার তার মেয়ে মাকে ডাকতে গেলে সাড়া না পেয়ে একজন নার্সকে ডাকেন। তিনি ভেবেছিলেন তার মা অসুস্থ। পরে নার্স বাসায় এসে দেখতে পান তিনি মারা গেছেন। এরপর বের হয়ে মানুষজনকে জানালে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন করে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। ওসি হাসান বাশির বলেন, বৃদ্ধার মেয়েকে দেখে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। মা মরে পচে আছেন, অথচ তিনি গন্ধও পাননি। তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতার কারণে আমরা মরদেহটি ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্তের পর লাশটি তার বুয়েটের শিক্ষক ছেলে গ্রহণ করেছেন।
পরিবারের সদস্যদের আচরণের বিষয়ে ওসি হাসান বাশির বলেন, পরিবারের অন্য সদস্যরাও কিছুটা অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘আমি তার যে ছেলে বুয়েটের টিচার তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বড় ভাইয়ের নাম্বার দেন। তিনি আমাকে একটা সিটিসেল নাম্বার বের করে দিয়েছেন। অথচ সিটিসেল অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তার মানে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের যোগাযোগ নেই।