সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন




প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর মালয়েশিয়ায়, কেন তাৎপর্যপূর্ণ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬ ১০:৫৯ am
মালয়েশিয়া malaysia bangladesh flags crossed waving flat মালয়েশিয়া বাংলাদেশ
file pic

যেকোনো দেশের সঠিক পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি প্রযোজ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার স্বল্পকালীন শাসনব্যবস্থা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় সাফল্য অর্জন করেছিল। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি আফ্রিকার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি জিয়ার সুসম্পর্ক তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ও পূর্বমুখী কূটনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। শহীদ জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমান কোন পথে হাঁটছেন, সেদিকে সবার তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদ জয় করে সরকার কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মাত্রাও আধিপত্যবাদী বৃহৎ প্রতিবেশীর শিরঃপীড়ার কারণ হচ্ছে।

সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। এ সফর ঘিরে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। যতটা জানা যাচ্ছে, আগামী ২১ ও ২২ জুন দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মালয়েশিয়া সফর শেষ করেই ২৩ থেকে ২৬ জুন তার চীনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ জোড়া সফরকে বিদ্যমান ভূরাজনীতিতে তারেক রহমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেন তারেক রহমান। নির্বাচনের পরপরই অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম—তিনজনই তাকে নিজ নিজ দেশে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সবদিক বিবেচনা করে তিনি প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন।

যতটা জানা যাচ্ছে, মালয়েশিয়া সফরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ওপর। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের জটিলতা দূর করে তা পুনরায় পুরোদমে চালু করা এ সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে সরকারের তরফে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।

ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এ সিদ্ধান্তের গভীর প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে। নতুন সরকারের প্রথম সফর হিসেবে দিল্লি বা বেইজিংয়ের যেকোনো একটিকে বেছে নিলে অন্য পক্ষের কাছে একটি ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। প্রথম সফরে একটি ‘তৃতীয় রাষ্ট্র’ তথা নিরপেক্ষ বন্ধুরাষ্ট্রকে বেছে নিয়ে বাংলাদেশ এক চমৎকার কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি জানান দিচ্ছে। বাংলাদেশ কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির বলয়ে তাড়াহুড়ো করে ঢুকছে না, তার ইঙ্গিতও থাকছে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। ভূরাজনীতির চেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণই যে এ সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, তাও জানান দেওয়া যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। প্রথম সফরে সেখানে যাওয়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব এবং আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বার্তা বহন করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের জট খুললে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হবে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। সামগ্রিকভাবে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দেশের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত পরিপক্ব ও কৌশলগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

ফিরে দেখা যাক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা, বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকটায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর অন্যতম মুসলিম দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশকে প্রথমদিকেই স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসনে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক অতটা গভীর ছিল না। জিয়াউর রহমানের সময় দুদেশের সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ না থেকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ নেয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কারণেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এবং ওআইসি ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের ভূমিকা সক্রিয় করা। মালয়েশিয়া মুসলিমপ্রধান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি প্রভাবশালী দেশ হওয়ায় জিয়াউর রহমান দেশটির সঙ্গে গভীর যোগাযোগ স্থাপন করেন। দুদেশই ওআইসি এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মঞ্চে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে একযোগে কাজ করে।
সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজেই মালয়েশিয়া সফর করেন। এছাড়া বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সম্মেলনে মালয়েশিয়ার তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এই ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সফরগুলো দুদেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা আর বন্ধুত্বকে সুদৃঢ় করে। ওই সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা আজকের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরও মূল ভিত্তি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—বাণিজ্য চুক্তি, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি, বিমান চলাচল সেবা চুক্তি, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তি এবং মানি অর্ডার চুক্তি।

১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে দুদেশের মধ্যে সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়। এটি দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ‘ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর’ বলা যায়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। এ চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল—প্রথমত দুদেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু ও সম্প্রসারণ করা, শুল্ক ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করে আমদানি-রপ্তানি সহজ করা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ সৃষ্টি করা।

১৯৭৭ সালে শহীদ জিয়ার হাতে করা চুক্তির পর থেকে দুদেশের মধ্যে যেসব পণ্য আমদানি-রপ্তানির পথ সুগম হয়, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বিস্তৃত হয়েছে। শুরুর দিকে প্রধানত চা, চামড়া ও কাঁচা পাট রপ্তানি হতো বাংলাদেশ থেকে। বর্তমানে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তৈরি পোশাক, ওষুধ, শাকসবজি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও প্লাস্টিক সামগ্রী।

অন্যদিকে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে মূলত পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, পাম অয়েল (সবচেয়ে বড় আমদানির খাত), রাসায়নিক পণ্য, লোহা ও ইস্পাত এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রী আমদানি করে থাকে।

মালয়েশিয়া সফরে তারেক রহমান সরকারের বৈদেশিক নীতিনির্ধারকদের দুদেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে বিশেষ নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শহীদ জিয়ার করা বাণিজ্য চুক্তিটি কেবল পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি পরবর্তী সময়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পথ উন্মোচন করেছিল। ১৯৭৭ সালের বাণিজ্য চুক্তির সফলতার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে দুদেশের মধ্যে ১৯৮৩ সালে সমুদ্র পরিবহন চুক্তি, ১৯৯২ সালে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি এবং ১৯৯৪ সালে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এতে বাংলাদেশের একটি বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ প্রায় তিন দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা বাংলাদেশকে চীনের পর মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান আমদানিকারক বানিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি পরবর্তীতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জনশক্তি রপ্তানির বাজারে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশে টেলিকমিউনিকেশন, বিদ্যুৎ ও টেক্সটাইল খাতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগের পথ খোলে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের দোরগোড়ায় রয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ বেশকিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। এ কারণে ১৯৭৭ সালের সাধারণ বাণিজ্য চুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এখন দুদেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি তথা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্তরে জোরালো আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

দুদেশ ইতোমধ্যেই এফটিএ নেগোশিয়েশনের মূল শর্তাবলি চূড়ান্ত করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঢাকা সফর এবং পরবর্তীতে দুদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনার পর এ প্রক্রিয়া অনেকটাই ত্বরান্বিত হয়। চলতি ২০২৬ সালের মধ্যেই মালয়েশিয়ার সঙ্গে এই মুক্তবাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত বা সই করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দুদেশ। বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং মালয়েশিয়ার জাতীয় বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও বাণিজ্য মিশন পরিচালনার জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এরই মধ্যে।

এফটিএ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু বড় দুয়ার খুলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক গুণতে হয়। এফটিএ হলে এই শুল্কহার শূন্য বা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব। দেশটির বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ হলে আসিয়ানের ৬৬ কোটি মানুষের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা সহজ হবে। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক এবং হালাল সামগ্রী মালয়েশিয়ার বাজারে বড় অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এফটিএর ফলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গাড়ি তৈরি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, ফার্নিচার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আরো বেশি উৎসাহিত হবেন।

তবে এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের এক বড় অংশ আসে আমদানি শুল্ক থেকে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ করলে দেশটি থেকে আমদানি করা পণ্যের (যেমন : পাম অয়েল, পেট্রোলিয়াম, কেমিক্যাল) ওপর শুল্কছাড় দিতে হবে, যা সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। দুদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য বর্তমানে মালয়েশিয়ার দিকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকে আছে। বাংলাদেশ যেখানে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, সেখানে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করে দুই দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পর বাংলাদেশ যদি দ্রুত উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে না পারে, তবে এ ঘাটতি আরো বাড়তে পারে।

তাছাড়া ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই বিভিন্ন আঞ্চলিক বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য রপ্তানি করছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। শুল্ক কমলেও মালয়েশিয়ার কঠোর স্যানিটারি, ফাইটোস্যানিটারি (খাদ্য ও উদ্ভিদের নিরাপত্তা মানদণ্ড) এবং হালাল সার্টিফিকেশনের নিয়ম-কানুন বা নন-ট্যারিফ বাধাগুলো টপকানো বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারেক রহমানের সফরকালে এ বিষয়গুলোতে সতর্ক পদক্ষেপ জরুরি।

ক্রসফায়ার-গুমের আড়ালে খুনিরা কি বেঁচে যাচ্ছেক্রসফায়ার-গুমের আড়ালে খুনিরা কি বেঁচে যাচ্ছে
বাণিজ্য চুক্তির বাইরে শহীদ জিয়ার সময়ে দুদেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়াতে ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে স্বাক্ষরিত সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুদেশের মধ্যে সরাসরি আকাশপথে যোগাযোগ ও বিমান চলাচলের আইনি কাঠামো তৈরি হয় ১৯৭৮ সালের জুলাইতে শহীদ জিয়ার সই করা বিমান চলাচলসেবা চুক্তির মাধ্যমে। সে সময় ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি হয়। যে চুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্পে পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত হয়। অনেকের ধারণা, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি অনেক পরে শুরু হয়েছে। তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা ও ভিত্তি তৈরি করেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের জেরে তিনি বিদেশে বাংলাদেশের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত ‘অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি’ ছিল তারই অংশ। পরবর্তীতে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম যে পাঁচ দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া জনশক্তি আমদানির চুক্তি করে, বাংলাদেশ ছিল তার অন্যতম।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের সুবিধার্থে ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাক্ষর করেন মানি অর্ডার চুক্তি। ডাক বিভাগের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের এ চুক্তিটি তখন দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি দেশপ্রেমমূলক এক শক্তিশালী স্লোগান। শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ারও দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয়। তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের স্বার্থই যে প্রথম ও সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে—এটা প্রত্যাশা করা যেমন অমূলক হবে না, তেমনি ভারসাম্যমূলক কূটনীতির ক্ষেত্রে এ সফর কতটা প্রভাব রাখবে, তা দেখতে উন্মুখ বাংলাদেশের জনগণ।

লেখক: এম-আবদুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও কলামিস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD