শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন




ফিরে দেখা জুলাই

শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ, ক্ষোভ থেকে অভ্যুত্থানের পথে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬ ১:৪৭ pm
Mass uprising martyrs injured injure July Martyr July Fighter July Fighters Abu Sayed Abu Sayeed abu_sayeed আবু সাঈদ আবু সাঈদ
file pic

১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে আত্মাহুতির ইতিহাস রচিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী সরকারের বঞ্চনা-লাঞ্ছনায় ক্ষুব্ধ তরুণ আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ালেন বন্দুকের মুখে। আগের দিন ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে তখন তাঁর বুকে বইছে ঝড়। ২২ বছরের তরুণ সাঈদ বললেন, ‘বুক পেতেছি গুলি কর।’

সাঈদের বুক বিদীর্ণ হলো কর্তৃত্ববাদী শাসকের পুলিশের গুলিতে। আবার উঠে দাঁড়ালেন। দুই হাত প্রসারিত করে আবার বুক পেতে দিলেন। গর্জে উঠল পুলিশের শটগান। টলমল পায়ে লুটিয়ে পড়লেন সাঈদ। রক্তে ভেজা এই তরুণ মাটিতে পড়লেন বটে, কিন্তু হয়ে উঠলেন সাহসের প্রতীক, বীরত্বের অমর গাঁথা। এমন এক মহাকাব্যিক চরিত্র, যারা অপেক্ষায় মুক্তি পাগল মানুষের শত শতাব্দী কেটে যায়।

ক্যামেরায় বন্দি আবু সাঈদের আত্মত্যাগের চিত্র ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থী। ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুরের সমন্বয়ক।

নিরস্ত্র তরুণকে প্রকাশ্যে হত্যা মেনে নিতে না পারা কোটি জনতা নেমে আসে রাজপথে। কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিণত হয় সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার লড়াইয়ে। যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পতনের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

সেদিন শুধু আবু সাঈদ নন, শহীদ হন আরও কয়েকজন। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের হামলায় জীবন দেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা এবং ওমরগণি কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত।

আজকের দিনটি পালিত হবে জুলাই শহীদ দিবস হিসেবে। রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান পৃথক বাণীতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শহীদদের রক্ত কখনও বৃথা যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অমর চেতনা কেবল ইতিহাসের গৌরব নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা।

শান্ত ক্যাম্পাস থেকে অশান্ত রাজপথ
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর শাসক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলায় আহত হন শত শত শিক্ষার্থী। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত চেহারার ছবিগুলো দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই হামলার প্রতিবাদেই ১৬ জুলাই দেশব্যাপী সর্বাত্মক বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

১৬ জুলাই সকাল থেকেই থমথমে ছিল সারাদেশ। দুপুরের পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে লাখো শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, এই দফায় তাদের সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করেন স্কুল-কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও।

ঢাকার প্রগতি সরণি, সায়েন্স ল্যাব, মহাখালী এবং উত্তরা এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। দুপুরের তীব্র রোদের মধ্যে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শেলের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আসে রাজপথ। বিকেল গড়াতেই একে একে আসতে থাকে মৃত্যুর খবর।

ঢাকার সায়েন্স ল্যাব ও সিটি কলেজের মধ্যবর্তী রাস্তায় সংঘর্ষের মাঝে পড়ে নিহত হন দুজন। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঢাকা কলেজের সামনে গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কলেজটির শিক্ষার্থী সবুজ আলীকে (২৫)। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় মাথায় গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয় পথচারী মো. শাহজাহানকে (২৪)।

ভয়াবহ রক্তাক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় চট্টগ্রামের মুরাদপুরে। বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে সেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় তিনজন নিহত হন। ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ছাড়াও ছাত্রলীগের হামলায় শহীদ হন নোয়াখালীর বাসিন্দা ও লালখানবাজারের একটি আসবাব দোকানের কর্মচারী মো. ফারুক (৩২)।

আইকনিক মুহূর্ত, আন্দোলনের নতুন ভাষা
আবু সাঈদের চোখে ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন। কিন্তু ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে পুলিশের ছররা গুলির আঘাতে তাঁর সেই স্বপ্নের অকাল মৃত্যু ঘটে।

মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে বন্দুকের নলের মুখে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে দাবানলের মতো সারাদেশে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আবু সাঈদের ওই দুই হাত প্রসারিত করা ছবি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্মরণীয় এক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এই একটি মৃত্যুই যেন ভয়ের দেয়াল ভেঙে দেয় সাধারণ মানুষের বুক থেকে।

১৬ জুলাই সারাদেশে মোট ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে। এই প্রাণহানির পর আন্দোলনের চরিত্র ও ভাষা রাতারাতি বদলে যায়। এর আগে শিক্ষার্থীদের মূল স্লোগান ছিল কোটার যৌক্তিক সংস্কার। কিন্তু এই রক্তাক্ত দুপুরের পর আন্দোলনকারীদের দাবি হয়ে ওঠে খুনিদের বিচার, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি।

সন্তানদের বাঁচাতে রাজপথে নেমে এলেন মায়েরা, সংহতি জানালেন বাবা-অভিভাবকরা। শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষও শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের করিডোরে তখন আহত শিক্ষার্থীদের স্বজনদের আহাজারি আর সাধারণ মানুষের রক্ত দেওয়ার আকুলতা এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে।

ছাত্রলীগ উৎখাত শিক্ষাঙ্গন থেকে
আগের দিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছত্রভঙ্গ করতে পারলেও, আবু সাঈদের আত্মাহুতির ভিডিও সামনে আসার পর শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিরে আসে। টানা ১৫ বছরের বেশি সময় আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ছাত্রলীগকে সেদিন অধিকাংশ ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ধাওয়ায় পালিয়ে যায় তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

চব্বিশের ১৬ জুলাই হামলার প্রতিবাদে শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে রাজু ভাস্কর্যে দেশি অস্ত্রসহ অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যার পর সর্বপ্রথম রোকেয়া হল থেকে ছাত্রলীগের ১০ নেত্রীকে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকা বিনতে হোসেনকে চুল ধরে বের করে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন ছেলেদের হলে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা করা হয়।

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী রিফতি আল জাবেদ সেই স্মৃতি থেকে সমকালকে বলেন, ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলায় অনেকে রক্তাক্ত হয়ে হলে ফিরে আসেন। যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলে কেউ মেনে নিতে পারেনি। তাই মেয়েরা জীবনের পরোয়া না করে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বের করে দেয়, অনেকের চুল ধরে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন শিক্ষার্থীদের সাহসী প্রতিবাদ শেখ হাসিনার পতনকে অনেক বেশি তরান্বিত করে।

দেশজুড়ে নানা আয়োজন
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। সরকারি নানা আয়োজনের পাশাপাশি দিবসটির কেন্দ্রীয় আয়োজন হবে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে শহীদ আবু সাঈদের স্মরণে শোকর‍্যালি, লাল ব্যাজ ধারণ, স্মৃতিচারণ সভা ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।

সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা সভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং শহীদদের স্মরণে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন থাকবে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্মরণসভা, আলোকচিত্র ও দলিলভিত্তিক প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

জিয়ারতে যাবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম এমপিসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় ঐক্য আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে র‌্যালি করবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথকভাবে শোকসভা, আলোচনা সভা, শহীদদের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, স্মরণানুষ্ঠান এবং দুস্থ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।

নিরাপত্তা জোরদার করেছে র‍্যাব
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে র‌্যাব। দিবসটি ঘিরে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্র যেন কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে গতকাল বুধবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে র‍্যাব।

এদিকে গোপালগঞ্জে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD