শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন




আবু সাঈদ: একটি প্রজন্মের সাহস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬ ২:০৮ pm
Mass uprising martyrs injured injure July Martyr July Fighter July Fighters Abu Sayed Abu Sayeed abu_sayeed আবু সাঈদ আবু সাঈদ
file pic

সরদার ফরিদ আহমদ

ইতিহাস কখনো কখনো একজন মানুষের বুকের উপর দাঁড়িয়ে লেখা হয়। কেউ ঘামে ভেজে সফল হয়। কেউ বৃষ্টিতে ভেজে ঘরে ফেরে। কিন্তু যে মানুষের জামা রক্তে ভিজে যায়, তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। আবু সাঈদ সেই ইতিহাসের নাম।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তিনি জানতেন, সামনে বন্দুক। জানতেন, গুলি আসতে পারে। জানতেন, মৃত্যু খুব কাছে। তবু পিছু হটেননি। বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই দৃশ্য শুধু একটি ভিডিও ছিল না। সেটি ছিল একটি জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার মুহূর্ত।

আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল না শুধু একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু। সেটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সর্বোচ্চ ভাষা। যে ভাষা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। যে ভাষা রক্ত দিয়ে লেখা হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন চলছিল। দেশের তরুণরা সমতার দাবি জানাচ্ছিল। সেই আন্দোলনের রংপুর অঞ্চলের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আবু সাঈদ। তিনি শুধু মিছিল করেননি। মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আন্দোলনের আগের দিন তিনি শহীদ অধ্যাপক শামসুজ্জোহার কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন, অন্তত একজন শামসুজ্জোহা হয়ে মরতে পারাটাই গর্বের। সেই কথার মধ্যেই যেন নিজের ভবিষ্যৎ লিখে দিয়েছিলেন তিনি।

১৬ জুলাইয়ের সেই বিকালে রাষ্ট্রের শক্তির সামনে দাঁড়িয়েছিল এক নিরস্ত্র তরুণ। তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল না কোনো ঢাল। ছিল শুধু সত্যের প্রতি বিশ্বাস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস। একের পর এক গুলি ছুটে এসেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ভঙ্গি বদলায়নি। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্য আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

ইতিহাসে কিছু ছবি সময়কে বদলে দেয়। ভিয়েতনামে নাপাম বোমায় দগ্ধ শিশুর ছবি যেমন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, তেমনি আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য বাংলাদেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি ছিল প্রতিবাদের নতুন প্রতীক। সাহসের নতুন সংজ্ঞা। আত্মত্যাগের নতুন ভাষা।

তার মৃত্যুর পর আন্দোলন আর আগের জায়গায় থাকেনি। সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাম। শহর থেকে মফস্বল। তরুণ থেকে প্রবীণ। সবাই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, একটি ন্যায্য দাবির জবাব কি গুলি হতে পারে? সেই প্রশ্নই পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানের শক্তিতে।

আবু সাঈদ কোনো বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামের একটি সাধারণ পরিবারে তার জন্ম। অভাব ছিল। সংগ্রাম ছিল। ৯ ভাইবোনের সংসারে শুধু তিনিই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার স্বপ্নকে ছোট করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তার সহপাঠীরা তাকে মনে রেখেছেন বিনয়ী, মেধাবী ও ভদ্র একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস তাকে মনে রাখবে একজন নির্ভীক তরুণ হিসেবে। যিনি নিজের জীবনের চেয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে বড় মনে করেছিলেন।

আজ আবু সাঈদ শুধু একটি নাম নন। তিনি একটি প্রতীক। তিনি প্রতিবাদের সাহস। তিনি মাথা নত না করার শিক্ষা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র কখনো বিনামূল্যে আসে না। প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে আত্মত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।

শহীদদের স্মরণ করা মানে শুধু আবেগে ভেসে যাওয়া নয়। তাদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ন্যায়সংগত দাবিকে সম্মান না করে, যদি সংলাপের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগকে বেছে নেয়, তাহলে সংকট আরো গভীর হয়। গণতন্ত্রের শক্তি বন্দুকের নলে নয়। জনগণের আস্থায়। যে রাষ্ট্র সেই আস্থা হারায়, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না।

আবু সাঈদের শাহাদত আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়। পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় নেতা প্রয়োজন হয় না। কখনো একজন সাধারণ তরুণও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। তার প্রয়োজন শুধু নৈতিক সাহস। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার মানসিকতা।

আজ ১৬ জুলাই আমাদের কাছে শুধু শোকের দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনার দিনও। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি, যেখানে ভিন্নমত নিরাপদ? যেখানে শিক্ষার্থীদের দাবি শোনা হয়? যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি জনগণের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের প্রকৃত সম্মান।

শহীদদের রক্তের সবচেয়ে বড় দাবি প্রতিশোধ নয়। ন্যায়বিচার। জবাবদিহি। আইনের শাসন। মানবিক রাষ্ট্র। এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো মা তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। সময় এগিয়ে চলছে। কিন্তু কিছু দৃশ্য সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। কিছু নাম ইতিহাসের পাতা ছেড়ে মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় নেয়। আবু সাঈদ সেই নামগুলোর একটি।

যখনই বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন চিন্তার কথা বলবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলবে, ভয়কে জয় করার কথা বলবে, তখনই ফিরে আসবে ১৬ জুলাইয়ের সেই বিকাল। ফিরে আসবে এক তরুণের অবিচল মুখ। ফিরে আসবে তার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অদম্য সাহস।

ইতিহাসে অনেক মানুষ জন্ম নেন। খুব কম মানুষ ইতিহাস হয়ে ওঠেন। আবু সাঈদ সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু একটি আন্দোলনের শহীদ নন। তিনি একটি যুগের বিবেক। একটি প্রজন্মের সাহস। একটি জাতির জাগরণের প্রথম শিখা।

শহীদদের স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় শুধু ফুল দেওয়া নয়। শুধু স্মৃতিচারণাও নয়। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ন্যায্য দাবির জবাবে গুলি চলবে না। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতিপক্ষ হবে না। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। আইনের শাসন থাকবে। মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাদের বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—সাহস সংক্রামক। একজন মানুষের সাহস কখনো কখনো পুরো জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। তাই ইতিহাসের পাতায় নয়, জাতির চেতনায় আবু সাঈদ চিরকাল বেঁচে থাকবেন। যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, তত দিন উচ্চারিত হবে সেই অমর আহ্বান—‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি, গুলি কর।’

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD