ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ঢাকা মহানগর। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিকদের দায়িত্বহীনতা এবং দুই সিটি করপোরেশনের তদারকির ঘাটতিতে নগরজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে আবর্জনা। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এর মধ্যে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন ও খানাখন্দে জমে থাকা পানি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে মিশে পুরো নগরকে আরো নোংরা ও দুর্গন্ধময় করে তুলেছে। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও আবার তীব্র দুর্গন্ধে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
একদিকে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরমে। শুধু পথচারী নন, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরাও সমান ভোগান্তিতে পড়ছেন। খোলা ম্যানহোল জলাবদ্ধ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় প্রায়ই রিকশার চাকা আটকে যাচ্ছে। আবার বাস, ট্রাক, পিকআপ বা সিএনজি দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় নোংরা পানি ছিটকে পথচারী ও যাত্রীদের গায়ে পড়ছে। এমন চিত্র রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটিতেই।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে মগবাজার ওয়্যারলেস গেট, মালিবাগ চৌরাস্তা, শান্তিনগরের বিভিন্ন অংশ, মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইন এলাকা এবং কারওয়ান বাজার ও তার আশপাশ।
রেললাইন এখন বর্জ্যের ভাগাড়
সরেজমিনে দেখা যায়, কমলাপুর স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তা, টিটিপাড়া থেকে আর কে মিশন রোড পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পাশে পশু জবাইয়ের বর্জ্য, পশুর মাথা, কান ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব থেকেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাসমান মানুষের বসতি এবং হকারদের দখলের কারণে নাজেহাল অবস্থা। মালিবাগ রেলগেট থেকে শুরু করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ মানিকনগর বিশ্বরোডের পুরোটা ময়লা-আর্বজনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও আশপাশের বাজারের বর্জ্য বছরের পর বছর রেললাইনের পাশে ফেলতে ফেলতে ছোট-বড় অসংখ্য ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, অন্যদিকে হকারদের দখল—পথচারীদের চলাচলের সুযোগই প্রায় নেই। খোলা জায়গায় জমে থাকা এসব বর্জ্য থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মালিবাগ-শান্তিনগরেও একই চিত্র
মালিবাগ-শান্তিনগর মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষমাণ এক কর্মজীবী নারী মুখে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চারপাশের ময়লা নোংরা দুর্গন্ধ আমি পাই আপনি পান না?
মালিবাগ চৌরাস্তার ফুটপাত, আইল্যান্ড ও ওভারব্রিজের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বর্জ্য। মালিবাগ পাবলিক টয়লেটের সামনের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চামেলিবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও মৌচাকমুখী সড়কের দুই পাশজুড়েও একই অবস্থা। ফ্লাইওভারের নিচে টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের দখলে তৈরি হয়েছে ময়লার স্তূপ।
রাজধানীর ভেতরে ও তার আশপাশের এলাকাতেও একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাতাসে ধুলাবালুর সঙ্গে উড়তে থাকে পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে রাস্তার অর্ধেক অংশ। ফুটপাতের অধিকাংশই প্রস্রাবের কারণে হাঁটার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও।
দক্ষিণ ঢাকায়ও ভয়াবহ অবস্থা
দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ডেমরা সড়কের কাজলারপাড় থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত ওয়াসার ড্রেন বর্জ্যে ভরে গেছে। টানা বৃষ্টিতে তা এখন খালের রূপ নিয়েছে। সায়েদাবাদ, ধলপুর, টিকাটুলি, গুলিস্তান, নাজিরাবাজার, শাখারীবাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, জুরাইন ও দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। বহু এলাকায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা ও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উত্তর ঢাকায়ও সংকট
উত্তর সিটির মেরাদিয়া থেকে রামপুরা পর্যন্ত কয়েকটি এসটিএস থাকলেও অনেক জায়গায় খোলা জায়গায় ভেজা ও শুকনা বর্জ্য আলাদা করার সময় ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা পরিমল বাবু প্রতিদিন মালিবাগ হয়ে কারওয়ান বাজারে অফিসে যান। তিনি বলেন, মালিবাগ রেলগেট এলাকায় রাস্তার ওপর পর্যন্ত ময়লা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর উন্নয়ন কাজের জন্য বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, উত্তরা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও বনানী এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টের সামনেই বর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে।
গত ১০ জুলাই মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং দোকানদারদের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। পরে মিরপুর-১২-এর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি এবং দোকানদার, বাজার কমিটি ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়, তবুও নেই সমাধান
জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, রাজধানীর ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ছয় হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৫৫ শতাংশই যথাযথভাবে সংগ্রহ করা যায় না।
জানা গেছে, গত সাত বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছে প্রায় তিন হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। তবু শহরজুড়ে রয়ে গেছে ২৫০টিরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়। ফলে বিপুল বর্জ্য খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চারটি ধাপ রয়েছে— বাড়ি থেকে প্রাথমিক সংগ্রহ, এসটিএসে জমা, ট্রাকে করে ল্যান্ডফিলে পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। কিন্তু এর প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ ধাপ অর্থাৎ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নেই। ফলে অধিকাংশ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খোলা জায়গায় ফেলা হয়।
কারওয়ান বাজারে কার্যত নেই নিয়ন্ত্রণ
রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বাজারের ভেতরের ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের কারণে কোথাও কোথাও ছয় ফুটে নেমে এসেছে। কিচেন মার্কেটের সামনে মুরগি জবাই ও সবজির বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলায় পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়।
ফুটপাত দখল, উন্মুক্ত ড্রেন, বর্জ্যের স্তূপ, জলাবদ্ধতা ও যানজট—সব মিলিয়ে কারওয়ান বাজারে নগরবাসীর দুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পণ্য খালাসের পর ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রেখে যান। নিয়ম অনুযায়ী কনটেইনারে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে পুরো বাজারই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
বর্জ্য থেকে পলিথিন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহকারী সালাম মিয়া বলেন, পুরো বাজারের ময়লা এখানে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি মাঝে মাঝে কিছু নিয়ে গেলেও অধিকাংশই পড়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞের মত
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এমনিতেই দুর্বল। এর সঙ্গে যদি সময়মতো এলাকা থেকে বর্জ্য অপসারণ না করা হয়, তাহলে রাস্তাজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হবে। সেখান থেকে মশা-মাছিসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়বে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে আরো কঠোর হতে হবে।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, রেললাইন ও রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা রেলওয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। সেসব এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাদের নিজস্ব জনবল রয়েছে। তবে নগরীর অন্যান্য এলাকায় টেকসই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নতুন জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।
তিনি আরো বলেন, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কোথাও অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো, কোনো বর্জ্য যেন ২৪ ঘণ্টার বেশি খোলা জায়গায় পড়ে না থাকে। আমার দেশ