শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৬ অপরাহ্ন




এই দিনে জুলাই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১১:০৭ am
Mass uprising martyrs injured injure July Martyr July Fighter July Fightersগণঅভ্যুত্থান QUOTA REFORM blockade shabag Shahbagh Shahbag Blockade শাহবাগ অবরোধ প্রতিবন্ধ আটক কারাগার আবরণ পরিবেষ্টন ঘেরাও shahbagh_quota_protest shahbagh quota protest shahbagh_quota_protest shahbagh quota protest2 বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই গণঅভ্যুত্থান
file pic

আগের দিন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে দমনের পর ধারণা করা হচ্ছিল, আন্দোলন হয়তো থেমে যাচ্ছে। তবে তা ভুল প্রমাণ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্তব্ধ থাকলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কমপ্লিট শাটডাউন সফল করতে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১১ জন শিক্ষার্থী সেদিন শহীদ হন।
তার পরও পিছু না হটে উত্তরা-আজমপুর, রামপুরা-বাড্ডা, মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডির রাজপথ দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দমাতে হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া

হয়। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন সরকারের পুলিশ পেরে ওঠেনি। রামপুরায় কানাডিয়ান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে হেলিকপ্টার করে পালায় তারা। এই দৃশ্য শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। এর স্মরণে আজ ১৮ জুলাই পালিত হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস। চব্বিশের ১৮ জুলাই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

সেদিন সকাল থেকে রাজপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দমনে পুলিশের সঙ্গে অস্ত্র হাতে নামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। উঁচু ভবনের ছাদ থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি ছোড়া হয়। সেগুলো কেনা হয়েছিল ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। স্নাইপারের গুলিতে উত্তরায় শহীদ হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সাবেক শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তিনি টিয়ার গ্যাসের শেলের ধোঁয়ার যন্ত্রণায় কাতর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর আগের মুহূর্তে বলা ‘পানি লাগবে পানি’ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
জ্বলে ওঠে ক্ষোভের আগুন। তা ঠেকাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং রাতে বন্ধ করা হয় ব্রডব্যান্ড সেবাও। সারাদেশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এক দিনে ৩৭ জন শহীদ হন। ২০১৩ সালের পর ১১ বছরে এক দিনে রাজপথে এত মৃত্যু দেখেনি দেশ।

আগের রাতে দখল করা যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, শনির আখড়ার রাজপথ ১৮ জুলাইয়েও দখলে রাখে ছাত্রদের পাশে নামা সাধারণ মানুষ। মোহাম্মদপুর থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে বছিলা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে নামেন মা-বাবারাও। তাদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদসহ দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। একের পর এক প্রাণহানি হলেও টেলিভিশনের খবরে তা ছিল না, সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে। সেদিন দুপুরে বিটিভি কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগের রাতে হল খালি করার নির্দেশের পর সেদিন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হয়। ধানমন্ডিতে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজকে হত্যা করা হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুপুরের দিকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আলোচনার প্রস্তাব দেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন, রক্তের বিচার ছাড়া সংলাপ হবে না।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নরসিংদী, মাদারীপুর ও সিলেট থেকে তীব্র সংঘর্ষের খবর আসে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ী বিশ্বরোডে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে রূপ নেয়, যেখানে পুলিশের একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিন ঢাকায় শহীদ হন নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইরফান ভূঁইয়া, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পারভেজ শাকিল, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জাহিদুজ্জামান তানভীন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আল হামীম সায়মন, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির রাব্বী মিয়া, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির আসিফ ইকবাল, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির।

মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের শহীদ হওয়ার নির্মম ঘটনাটি সারাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। পুলিশের রায়ট কার থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালালে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন ইয়ামিন। তিনি গাড়িতে উঠে পড়লে, সেখানেই তাকে গুলি করা হয়। গুরতর আহত অবস্থায় তাঁকে রায়ট কার থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে কয়েকজন পুলিশ উঁচু করে ধরে চার ফুট উচ্চতার সড়ক বিভাজক থেকে ফেলে হত্যা করে।
সেদিনই সরকার জানায়, কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুই দিন পর ২১ জুলাই আপিলের শুনানি হবে হবে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী সারাদেশে এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাদের উস্কানির জন্য সারাদেশে কয়েকজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে।’ samakal

আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি

সকাল সোয়া ৯টা। ১৮ জুলাই, ২০২৪। কমপ্লিট শাটডাউন চলছে। ফেসবুক খুলতেই দেখি শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল পুলিশ। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে ছুটে মেয়ের রুমে ঢুকে দেখি, ফাঁকা। পেছন থেকে ছোট মেয়ে বলল, প্যানিক করো না। আপি ম্যাচ, নিউজ পেপার, পেস্ট, এন্টিকাটার আর মরিচ গোলানো পানি নিয়ে ব্র্যাকে গেছে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পুলিশ গুলি ছুড়ছে। একদিন আগে আবু সাঈদ-ওয়াসিমসহ ছয়জন মারা গেছে। আর এরা এন্টিকাটার আর মরিচের গুঁড়া নিয়ে সাহস দেখাচ্ছে!

আগের রাত থেকেই পাবলিক ইউনির্ভাসিটিগুলোর হলে আর শিক্ষার্থীদের থাকতে দিচ্ছে না প্রশাসন। পুলিশ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবে রাজু ভাস্কর্য বা টিএসসি—কোথাও জড়ো হতে পারছে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

প্রায় অবরুদ্ধ পুরো শহর। দমবন্ধ এই পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই রাস্তায় নেমে আসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাজার হাজার। ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্দান, নর্থ সাউথের তরুণ-তরুণীরা আন্দোলনে নতুন করে আগুন ধরায় সেদিন, যা ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

আগে থেকেই মেসেজিং অ্যাপ ডিসকোর্ডে গ্রুপ খোলে তারা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে শেয়ার হতে থাকে গ্রুপের লিংক। চেষ্টা ছিল ১৮ তারিখে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মাঠে নামানোর।

আমার আগের রাত কেটেছে মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। কেন সে রোজ আন্দোলনে যোগ দিতে যাচ্ছে? সে পড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। বিসিএস কখনো দেবে না। কোটার তার প্রয়োজন নেই। দেশে থাকবে কি না তারও ঠিক নেই। ঘরকুনো, নিজের মধ্যে থাকা একটি মেয়ে কেন যাবে? প্রশ্নের চেয়েও জবাবগুলো ছিল অনেক তীক্ষ্ণ, ফেলো স্টুডেন্টরা গুলি খাবে, মরবে আর সে কাওয়ার্ডের মতো ঘরে বসে থাকবে? সব শেষে বলল, ‘একাত্তরে তোমার মতো মা থাকলে এ দেশ আর স্বাধীন হতো না।’

ওদের পরিকল্পনা কোনোভাবে লিক হয়ে গিয়েছিল। ১৮ জুলাই ভার্সিটির গেটে আগেই পুলিশ এসে অবস্থান নেয়। পুলিশকে সামনে রেখে রাস্তায় বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ওদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল, আইডি কার্ড নেই এমন কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া যাবে না। অচেনা অনুপ্রবেশকারীদের বিক্ষোভে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।

অল্প সময়ের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। ধাওয়া দিয়ে তুলে দেয় শিক্ষার্থীদের। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এক পর্যায়ে ব্র্যাকের গেট খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ বাইরে থেকে টিয়ার শেল ক্যাম্পাসে ছুড়তে থাকে। কোণঠাসা হয়ে পড়ে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা।

এ সময় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ব্র্যাকের দিকে ছুটে আসে। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে এগোতে থাকে নর্থ সাউথসহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা। রোকেয়া সরণির পুরো রাস্তা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

মেয়ের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হয় বেলা সাড়ে ১১টায়। ফোন করে জানায়, ক্যাম্পাসে আছে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ওরা কেউ শ্বাস নিতে পারছে না। মুখ ও হাতে পেস্ট মেখেছে। খবরের কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া বানানোর পরও ঝাঁজ যাচ্ছে না।

আমি তখন যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় একটি অনলাইন পোর্টালে কাজ করি। সিদ্ধান্ত নিলাম অফিসে যাব, ওখান থেকে হেঁটে ব্র্যাকে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব। ভেঙে ভেঙে অফিসে পৌঁছালাম। কিছুটা অফিসের গাড়িতে, কিছুটা রিকশায় আর বাকিটা হেঁটে। স্টুডেন্টদের বাধা, পুলিশ-ছাত্রলীগের ব্যারিকেড পার হয়ে ব্র্যাক পর্যন্ত আর এগোনো গেল না।

সারা দেশ থেকে ভয়াবহ নৃশংসতার খবর আসতে থাকে। দেশের ৪৭ জেলায় পুলিশ-র‌্যাব, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় ৩১ জন নিহত হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ২৬ জন। শুধু ঢাকায়ই নিহত হয় ১৯ জন।

ঘণ্টাখানেক চুপ থাকার পর মেয়ের এসএমএস আসে। পুলিশ বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে বৃষ্টির মতো গুলি করছে। বহু স্টুডেন্টের শরীরে গুলি লেগেছে। বলল, ‘পাখির মতো স্টুডেন্টদের মারছে ওরা।’ মনে হলো কেউ খুব শক্ত হাতে কঠিনভাবে আমার গলা টিপে ধরেছে। শ্বাস নিতে পারছি না। আরেকটি বড় টেক্সট ফোনে ঢুকল, পুলিশের গুলি থামাতে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। হাতে লাঠি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিচ্ছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল হাতে নিয়ে আবার ছুড়ে দিচ্ছে পুলিশের দিকে। সঙ্গে যোগ দিয়েছে ইস্ট ওয়েস্টসহ আরো কয়েকটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা।

প্রাণ বাঁচাতে কানাডিয়ান ইউনিভাসির্টির দোতলায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পুলিশ। তবে সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি আর টিয়ার শেল ছুড়ছে তারা।

এবার আর টেক্সট না, ফোনই করে মেয়ে। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভেতরে ঢুকে ওই পুলিশ সদস্যদের থামাতে যাচ্ছে ওরা। জানিয়েই ফোন কেটে দিল। হতবিহ্বল লাগছিল। এর ৩০-৩৫ মিনিট পর জানালো দোতলায় আটকে পড়া পুলিশ ছাদে উঠে গেছে। ওদের গুলি-টিয়ার শেল শেষ। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দখল করে আছে স্টুডেন্টরা। এক পুলিশ সদস্যকে ওরা ধরে ফেলেছিল। তার কাপড় খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কিছু চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

এর মধ্যেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। উত্তরা, সাভার, যাত্রাবাড়ী রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে টেলিফোনে খবর আসছে। ছাত্র মারা যাওয়ার খবর আসছে। ধানমন্ডিতে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ নিহত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে উত্তরার নর্দান ইউনিভাসিটির আসিফ ও শাকিল নামে দুটি ছেলে। উত্তরায় এপিসি নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে পুলিশ।

দুপুরের দিকে বাড্ডা থেকে সহকর্মী ফোন করলেন। জানালেন, ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের রেসকিউ করার জন্য র‌্যাবের হেলিকপ্টার যাচ্ছে। আমার মেয়ে চাইলে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে। মেয়েকে জানালাম। উত্তরে মেয়ে জানাল, ‘আমি প্রোটেস্ট করতে আসছি। আমি কাওয়ার্ড না। আমি পালাব না।’ ফোনটা বন্ধ করে দিল। আমি কোনোভাবেই আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না।

বিকালে শাহবাগে জড়ো হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। সাড়ে ৫টার দিকে কফিন মিছিল শুরু হতেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্র-জনতা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করে প্রশাসন। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে নিজ ভবনে আটকে পড়েন উপাচার্য। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের উদ্ধার করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় শিক্ষার্থীরা, আহত হয় শতাধিক। সারা দিনে সারা দেশে শুধু পুলিশের হিসাবেই আহত হয় দেড় হাজার মানুষ।

বিকালের দিকে বিটিভির কার্যালয়েও একাধিকবার হামলা চালানো হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় মেয়ে আমাকে ফোন করে। জানায়, এবার সে বাড়ি ফিরতে চায়। রাস্তায় কোনো বাস বা রিকশা নেই। পুলিশ নেই। শিক্ষার্থীরা ফিরছে। তার আর হাঁটার শক্তি নেই। এবার আমি আমার সহকর্মীর সহায়তা নিতে পারলাম। তিনি মেয়েকে নিয়ে অফিসে ফিরলেন। আমার টুকটুকে ফর্সা তালপাতার সিপাই মেয়ে পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। মনে হলো কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। গলার কাছে উঁচু হয়ে আছে ছোট্ট একটি বল । কী ওটা? চামড়া সরে লাল হয়ে আছে জায়গাটা। ছররা বুলেটের টুকরা? মাথা থেকে বলটাকে ঝেড়ে ফেললাম। মেয়ে বেঁচে আছে। সুস্থ। আর কী চাওয়ার আছে? সিদ্ধান্ত নিলাম পরদিন থেকে চাকরি-বাকরি বাদ। মেয়ের সঙ্গে বিক্ষোভে নামব। amardesh




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD