আটলান্টার আকাশজুড়ে তখন এক অদ্ভুত নিশীথ-গোধূলির মায়া। ঘণ্টা কয়েক আগে ইংলিশ দর্পকে চূর্ণ করে বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। বাতাসে তার রেশ তখনও। ডাউনটাউনের পিচঢালা রাস্তায় নীল-সাদা সমর্থকদের উন্মাদনার শেষ প্রতিধ্বনিটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। পাবগুলোতে মুখ কালো করে বসে নিজেদের মধ্যেই থাকার চেষ্টা করছেন ইংলিশ সমর্থকরা। বিশ্বাস ভঙ্গের প্রচণ্ড ধাক্কাটা তাদের চোখেমুখে। অথচ এই বিশ্বাসের জোরেই পুরো বিশ্বকাপে ট্রাম্পের আমেরিকাকে সকার থেকে ফুটবলের মায়ায় ফেলে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। সেই তাদের জন্যই মিক্সড জোনে এসে ভরসা দিয়ে গেছেন লিওনেল মেসি– ‘আমাদের ম্যাচগুলো উপভোগ করুন। এই দল আপনাদের হতাশ করবে না।’ রোববার নিউ জার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে মেসির বলা এই অমোঘ আপ্তবাক্য আশা দেখাচ্ছে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি এনে দেওয়ার।
শুধু আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উদ্দেশেই নয়; এদিন তাঁর কিছু জবাব ছিল সেই তাদের জন্য, যারা কিনা বারবার আর্জেন্টিনার জয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। ‘আবার আমরা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি। চার বছর ধরে আমাদের দলটিই সেরা। কিছু লোকের কাছে ভালো লাগুক বা নাই লাগুক। আমাদের নিয়ে কে কী বলল, তা আমরা কানে দিই না। আমরা যা অর্জন করেছি, তা কারও দয়ায় নয়; কেউ আমাদের এটি উপহার হিসেবে এনে দেয়নি। খুব কম দলই আছে, যারা কিনা টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে।’ ইতিহাস বলে, জার্মানি আর ব্রাজিল অবশ্য টানা তিনটি ফাইনাল খেলেছে। ১৯৮২, ১৯৮৬ আর ১৯৯০ সালে জার্মানি টানা তিন ফাইনালের একটিতে জিততে পেরেছিল। ব্রাজিল তাদের স্বর্ণসময়ে ১৯৯৪, ১৯৯৮ আর ২০০২ তিন-তিনবার ফাইনাল খেলে দুটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৮ আর ২০২২ ফাইনাল খেলে এমবাপ্পের ফ্রান্স একবার ট্রফি স্পর্শ করতে পেরেছিল। এবার মেসির সামনে সুযোগ এসেছে বিশ্বকাপের দ্বিমুকুট মাথায় তোলার।
কোপা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বনাম ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ইতালিয়ান ভাষায় বিশ্বফুটবলে দুই মহাদেশের দুই চ্যাম্পিয়নের এই লড়াইকে ‘ফিনালেসিমা’ বলেই চিনে থাকে সবাই। ফিফার খুব ইচ্ছা ছিল, এবারের বিশ্বকাপের আগে আগে অন্তত দুই চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি করতে। ভেন্যুও ঠিক হয়ে গিয়েছিল কাতারের সেই লুসাইলে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে সেটি ভেস্তে যায়। নিয়তির কী খেলা, সেই ফিনালেসিমাই কিনা এবার হচ্ছে বিশ্বকাপের ফাইনালে। মেসির ভাষায়, ‘সেরা দুটি দলই ফাইনালে উঠেছে।’ এক প্রান্তে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে নামছেন মহাজাগতিক ওস্তাদ; অন্য প্রান্তে তাঁরই অপার্থিব জাদুকরি ছোঁয়ায় ধন্য বার্সেলোনার নতুন রাজপুত্র, ভোরের উদীয়মান সাগরেদ লামিনে ইয়ামাল। ওস্তাদ বনাম সাগরেদের এই ঐতিহাসিক রণক্ষেত্রে নামার আগে আটলান্টার রাতকে স্তব্ধ করে মেসির এই একটিমাত্র উক্তিই বুঝিয়ে দেয়– এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা দাক্ষিণ্যের মুকুট পরে না, তারা নিজেদের শর্তেই সাম্রাজ্যের শেষ তানটি গাইতে আসছে।
এদিন টানটান স্নায়ুর সংহাররূপী লড়াইটা শুরু হয়ে গিয়েছিল ম্যাচের প্রথম বাঁশির অনেক আগেই, যখন আটলান্টার গগনবিদারী শব্দের মাঝে দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজছিল। প্রথমার্ধে ফুটবলীয় শিল্পকে আড়ালে ঠেলে মাঠজুড়ে কেবলই দেখা গেল ফাউলের ছড়াছড়ি আর শারীরিক শক্তির এক নগ্ন আস্ফালন। সেই ধোঁয়াটে কুয়াশা কেটে আসল ফুটবলের মহাজাগতিক ক্যানভাসটা উন্মোচিত হলো তখনই, যখন গর্ডনের গোলে থ্রি-লায়ন্সরা এগিয়ে গেল। অতি-রক্ষণাত্মক থমাস টুখেল হয়তো তখন ডাগআউটে বসে ভেবেছিলেন, এই এক গোলের লিড আর ডিফেন্সিভ ব্যূহ দিয়ে বুঝি অবরুদ্ধ করে দেওয়া যাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ব্রিটিশ সাহেবরা জানতেন না, মেসির এই দলটার মেন্টাল টাফনেস আর ফুটবলীয় শৈলী কোন ধাতুতে গড়া!
ম্যাচের শেষ কুড়ি মিনিট আটলান্টার মাঠ দেখল এক প্রলয়ংকরী সুনামি। হুলিয়ান আলভারেজ আর এনজো ফার্নান্দেজদের মুহুর্মুহু আক্রমণে রীতিমতো খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল ইংলিশ ডিফেন্স। একের পর এক মারণাস্ত্রে ইংলিশদের যখন কাহিল অবস্থা, ঠিক তখনই জাদুকরের সেই অমোঘ জাদুর কাঠির ছোঁয়া। মেসির এক অপার্থিব, নিখুঁত ডিফেন্সচেরা পাসের ঠিকানায় কিক করে বল জালে জড়ালেন এনজো ফার্নান্দেজ; তারপর হেডে লাউতারো মার্টিনেজ। কাতারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড হয়তো আর্জেন্টিনার এই অতি-হিংস্র, খুনে মানসিকতা দেখার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আটলান্টার এই রুদ্ধশ্বাস রাতে ব্রিটিশরা হাড়ে হাড়ে টের পেল– লোকে পছন্দ করুক বা না করুক, চ্যাম্পিয়নদের খেলা কাকে বলে আর সিংহাসন কীভাবে নিজের ঘামে লিখে নিতে হয়!
ম্যাচ শেষে চেনা সাংবাদিকরা মেসির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকার সময় আপনার কি একটুও দুশ্চিন্তা হয়নি? মেসি চেপে কথা বলার মানুষ নন। তাই সরল স্বীকারোক্তি তাঁর, ‘নাহ, কখনোই না। আমার মধ্যে কোনো সন্দেহ ছিল না যে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। যখন এই দলটি একসঙ্গে হয়ে কিছু করতে নামে, তখন তাতে সফল হয়। তারা নিজেদের মধ্যেই বিশেষ কিছু খুঁজে পায়। জয়ের পর শারীরিক ব্যথা সব সেরে গেছে। আমরা যেটি খেলতে চেয়েছিলাম, সেটিই খেলতে পেরেছি।’ সতীর্থদের প্রতি এই আস্থা তাঁকে কোথায় নিয়ে গেছে, তা বোঝা যায় মাঠে যখন তাঁকে ফাউল করে এক ইংলিশ ফুটবলার, তখন পুরো মাঠ থেকে সাতজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার দৌড়ে এসে রেফারিকে চার্জ করতে থাকেন। তখন দেখে মনে হয়, এই মেসি একা নন; পুরো দল নিয়েই একজন মেসি।