সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৭ অপরাহ্ন




চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গায়েব ২৫০ কনটেইনার

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:১৭ pm
এলসি container exports বন্দর আমদানি বাণিজ্য import trade trade Export Promotion Bureau EPB Export Market বাণিজ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি export
file pic

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৫০টি পণ্যভর্তি কনটেইনার গায়েব হয়ে গেছে। চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসব কনটেইনার খালাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এমনকি এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমেও ডেলিভারি স্ট্যাটাসে লক করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে কনটেইনারগুলোর কোনো হদিস নেই।

বড় একটি সিন্ডিকেট এসাইকোডা সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেঙে কনটেইনারগুলো বের করে নিয়ে গেছেÑ এমন তথ্যের ভিত্তিতে কনটেইনারগুলোর হদিস চেয়ে পাঁচ দফায় চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। কিন্তু সাত মাসের মধ্যে একটি চিঠিরও উত্তর দেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে এসব কনটেইনারে কী এসেছে সে সম্পর্কেও ধারণা নেই কারো। যা বন্দর এমনকি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন ঘোষণায় আমদানি করা পাঁচ শতাধিক কনটেইনার খালাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি কনটেইনার আমদানিকারক ডেলিভারি নিয়ে গেছেন আর কিছু কনটেইনার নিলাম হয়েছে। কিন্তু ২৫০টি কনটেইনার আমদানিকারকের পক্ষে কেউ বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। অর্থাৎ এই কনটেইনারগুলো ডেলিভারি নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেউ। ২০২১ সালের পর থেকে প্রতি বছর এই কনটেইনারগুলোর তালিকা করে আসছে কাস্টম হাউস। ২০২৫ সালে শুল্কফাঁকি দিয়ে আনা দুই কনটেইনার কাপড় ডকুমেন্টের ভিত্তিতে নিলাম তোলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি কোম্পানি নিলামে কনটেইনার দুটি কেনে। টাকা পরিশোধের পর ইয়ার্ডে গিয়ে আর কনটেইনার দুটি খুঁজে পাননি তিনি। এতেই শুরু হয় তোলপাড়। এতদিন কাগজ-কলমে থাকা কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানার উদ্যোগ নেয় কাস্টম হাউস। আর তাতে খাতা-কলমের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক সামনে আসে।

এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক স্ট্যাটাসে থাকা ২৫০টি কনটেইনারের অস্তিত্ব পায়নি কাস্টম হাউস। এর মধ্যে ২০২১ সালে ডেলিভারি কার্যক্রম লক করা কনটেইনারের সংখ্যা রয়েছে ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি কনটেইনারের হদিস পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, কনটেইনারগুলো বন্দর থেকে বের করে নিয়েছে চোরাচালান সিন্ডিকেট চক্র। এরপর থেকে কনটেইনারগুলোর হদিস চেয়ে একে একে পাঁচটি চিঠি দিলেও তার কোনো জবাব দেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চিঠিতে স্বাক্ষর করা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ জানান, কনটেইনারগুলোতে ঘোষণা-বহির্ভূত চোরাই পণ্য আছেÑ এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আইজিএম (জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো) পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনারগুলোর খালাস লক করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পরে যখন বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়নি অর্থাৎ কেউ পণ্য খালাসের কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তখন কনটেইনারগুলোর কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বন্দরে কনটেইনারগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেহেতু কনটেইনারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের সব দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের, তাই বন্দরকে কনটেইনারগুলো খুঁজে দিতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসের চিঠির কোনো জবাব দেয়নি।

কনটেইনারগুলো ইতিমধ্যে বের হয়ে গেছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক মাহমুদ জানান, বন্দরের ভেতরে ৩৫ হাজারের বেশি কনটেইনার জমা থাকে। এর ভেতরে ওই কনটেইনারগুলো আছে কি না সেটা বন্দর কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। বন্দর স্পষ্ট করে না জানানোয় ধরে নেওয়া যায় কনটেইনারগুলো হারিয়ে গেছে।

বন্দর সূত্র জানায়, ২৫০ কনটেইনার গায়েবের ঘটনা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি। কারণ অতীতে বড় বড় অস্ত্র ও মাদকের চালান এই বন্দর দিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল সবচেয়ে বড় অবৈধ অস্ত্রের চালান আটক হয় চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী নদীর সিইউএফএলের জেটি ব্যবহার করে অস্ত্রগুলো খালাস করার সময় ১০ ট্রাকভর্তি চার হাজার ৯০০টি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭ হাজার গ্রেনেড, আট লক্ষাধিক গুলি ও রকেট লঞ্চার উদ্ধার করা হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এছাড়া ২০১৫ সালের ৬ জুন সূর্যমুখী তেলের ঘোষণা দিয়ে ৩৭০ লিটার তরল কোকেন আমদানি করে কতিপয় চোরাকারবারী চক্র। যার আনুমানিক মূল্য ছিল ৯০০ কোটি টাকা। এটিও দেশের ইতিহাসে আটক হওয়া সবচেয়ে বড় কোকেন চালান বলে চিহ্নিত। ২০২০ সালে আদালতের নির্দেশে কোকেনগুলো ধ্বংস করা হয়।

২০২১ সালের ১ জুন সরিষা বীজ ঘোষণা দিয়ে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা ৪২ টন পপি সিড আটক করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। ২০২২ সালের ২৪ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত তিন ধাপে পাঁচ কনটেইনার বিদেশি মদ ও সিগারেটের চালান আটক করা হয়। এছাড়া অস্ত্র ও মাদকের মতো ছোট-বড় অসংখ্য চালান আটক করা হয় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদ জানান, এসব কনটেইনারে কী এসেছে তা জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানে শুধু শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে উচ্চশুল্কের পণ্য এসেছে এমনটা নাও হতে পারে। অতীতে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানও এই বন্দরে এসেছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ আসার নজিরও আছে। এই বাস্তবতায় দেশের জন্য ক্ষতিকর, মানুষের জন্য ক্ষতিকর এমন একটি কনটেইনারও এলে সেটা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি। ছয় মাসে কাস্টমসের চিঠির জবাব না দেওয়াটা বড় ধরনের দায়িত্বে অবহেলা। বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানাত। যদি সত্যিই বের হয়ে যায়, তবে তা উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তত কনটেইনারগুলোতে কী পণ্য এসেছে, সেটা জানাটা জরুরি। দিন যত যাবে, এই প্রক্রিয়া ততই জটিল হবে।

বিষয়টি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কাস্টমসের চিঠিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য মেরিন কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহর কাছে পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু বন্দরের সচিব এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানান, বন্দরে একটি বড় সিন্ডিকেট বিভিন্ন ডকুমেন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাস করার অপচেষ্টা করছে। তারা শুধু ডকুমেন্ট জালিয়াতিই নয়, ডিজিটাল জালিয়াতিও করছে। চক্রটিকে চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম জানান, একটি কনটেইনার জাহাজ থেকে নামানো আর উঠিয়ে দেওয়াই বন্দরের প্রধান কাজ। একটি কনটেইনার বন্দর থেকে বের করতে হলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া প্রায় অসম্ভব। জাল কাগজপত্র দিয়ে কনটেইনার বের করে নিয়ে যাওয়ার নজির অনেক আছে। বন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরা দুই একটি চালান ধরে ফেললে কাস্টমসের কর্মকর্তারা বলে এই স্বাক্ষর তাদের নয়। আবার কনটেইনার বের হয়ে যাওয়ার পর এসাইকোডা সিস্টেমে লক করার নজিরও আছে। এক কথায় বন্দরের ভেতর থেকে কোনো কনটেইনার গায়েব হয়ে গেলে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, একইভাবে কাস্টমসের দুর্বলতাও প্রকাশ পায়। এখানে বন্দর বা কাস্টমস দুই পক্ষকেই সমানভাবে দায় নিতে হবে। আমার দেশ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD