রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন




বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে জোর গোলাম মোয়াজ্জেমের

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬ ৫:৫৯ pm
Khondaker Golam Moazzem economist Centre for Policy Dialogue CPD সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
file pic

দেশের জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি) সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের (ডিআরইপি) সমন্বয়ক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনা সাধারণত বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ু বা জলবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এখন সময় এসেছে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ এটি বড় জমির প্রয়োজন ছাড়াই বাড়ির ছাদ, শিল্পকারখানা, কৃষিখামার কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে স্থাপন করা সম্ভব এবং বিদ্যমান বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

সমন্বয়ক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামীদিনে বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানার রুফটপ সোলার, কৃষিতে অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সোলার হোম সিস্টেমই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।

রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীতে ‘ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি: দ্য ফিউচার সোলার সলিউশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং ডিআরইপি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

ডিআরইপি সমন্বয়ক বলেন, বর্তমানে দেশে নেট মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সোলারের সক্ষমতা ২১৩ মেগাওয়াট। এর বাইরে নন-নেট মিটারিং রুফটপ সোলার ৯৪ মেগাওয়াট, সোলার হোম সিস্টেম ২৬৩ মেগাওয়াট, সৌরচালিত সেচ পাম্প ৬০ মেগাওয়াট, স্ট্রিটলাইট, চার্জিং স্টেশন ও অন্যান্য সৌরব্যবস্থা ১৭ মেগাওয়াট এবং মিনিগ্রিড প্রায় ৬ মেগাওয়াট। সবমিলিয়ে দেশে প্রায় ৬৫৫ মেগাওয়াট বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে উদ্যোক্তারা দ্রুত রুফটপ সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে সরকারও স্বীকার করছে যে জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটবে না এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

‘তাই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। শিল্পে জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষিতে সৌরভিত্তিক সেচ ও মিনিগ্রিড, পরিবহনে বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং আবাসিক খাতে বৈদ্যুতিক চুলা ও ব্যাটারি ব্যবহারের প্রসার আগামীদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেবে। হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও রুফটপ সোলার ও ব্যাটারির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।’

সমন্বয়ক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ, আইনগত কাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি) গঠন করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নীতিগত সহায়তা দেবে। তিনি আরও বলেন, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশ বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশেও জেলা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি টেকসই, নিরাপদ ও স্বল্প ব্যয়ের জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।০

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে সরকারি কর্মসূচির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি করা গেলে বাজারও সেই চাহিদা অনুসরণ করবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার নীতিগত সংস্কার, কর-প্রণোদনা, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সহজ অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তার ভাষায়, ‘প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষের চাহিদা তৈরি করা। চাহিদা তৈরি হলে সরবরাহও সেই পথেই এগোবে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণসাক্ষরতা অভিযান, খাল খনন কর্মসূচি এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল বলেই সফল হয়েছে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এনজিও, নাগরিক সমাজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

উপদেষ্টা বলেন, গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে গ্যাস ও এলপিজির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় কমার পাশাপাশি সঞ্চয় বাড়বে এবং সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের আমদানি ব্যয়ও কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি জানান, সরকার সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদনে উৎসাহ দিচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর-কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণেও কাজ চলছে।

ড. তিতুমীর বলেন, প্রতিটি এনজিও তাদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে পুনঃঅর্থায়ন ও সহজ শর্তে অর্থায়নের নতুন উদ্যোগও নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, শুধু কর-প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদে নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এ খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় সরকার।

আগের স্বৈরাচার সরকারের সমালোচনা করে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে একটি ‘বিষাক্ত ব্যবস্থা’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় দেশকে আমদানিনির্ভরতার চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতের বিষাক্ত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না; সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।’

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে অনিশ্চয়তাই নতুন বাস্তবতা। তাই আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে স্বাবলম্বী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সে লক্ষ্যেই সরকার ধাপে ধাপে এনার্জি মিক্সে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গৃহস্থালি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এনজিও, বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, পল্লী বিদ্যুৎসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত জনসচেতনতা সৃষ্টি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারলে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD